Dark Mode
Image
  • Tuesday, 27 October 2026
মনের কথা শুনছে এআই, ভরসা কতটা?

মনের কথা শুনছে এআই, ভরসা কতটা?

মন খারাপ, সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা জীবনের নানা সংকটে এখন অনেকেই কথা বলছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চ্যাটবটের সঙ্গে। রাতের নিঃসঙ্গতায় মনের কথা বলা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান খোঁজা—অনেকের কাছেই এআই হয়ে উঠেছে সহজলভ্য এক পরামর্শদাতা। কিন্তু মানুষের আবেগ বুঝে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রে এআই কতটা নির্ভরযোগ্য?

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে এআই চ্যাটবটের দেওয়া সব পরামর্শ নিরাপদ বা উপযুক্ত নয়। ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত পরিস্থিতি ঠিকমতো না বুঝে সাধারণ উত্তর দেওয়া, ক্ষতিকর ধারণাকে সমর্থন করা কিংবা সংকটের মুহূর্তে প্রয়োজনীয় সহায়তার পথ দেখাতে ব্যর্থ হওয়ার মতো সমস্যা শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা।

যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটির গবেষক জাইনাব ইফতিখারের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় এআইয়ের মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত পরামর্শের নৈতিক দিকগুলো বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে এএএআই/এসিএম কনফারেন্স অন এআই, এথিকস অ্যান্ড সোসাইটির কার্যবিবরণীতে।

গবেষণায় উঠে এসেছে ১৫ ধরনের নৈতিক ঝুঁকি

গবেষকেরা প্রায় ১৮ মাস ধরে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের সঙ্গে কাজ করে এআইয়ের পরামর্শ দেওয়ার ধরন পরীক্ষা করেন। এ কাজে অংশ নেন তিনজন লাইসেন্সপ্রাপ্ত ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী এবং সাতজন প্রশিক্ষিত সহকর্মী পরামর্শদাতা।

গবেষণায় জিপিটি, ক্লড ও লামার মতো বৃহৎ ভাষা মডেলের আচরণ পর্যালোচনা করা হয়। মোট ১৩৭টি কাউন্সেলিং সেশন বিশ্লেষণ করে পাঁচটি প্রধান ক্ষেত্রে ১৫ ধরনের নৈতিক ঝুঁকি চিহ্নিত করেন গবেষকেরা। সেশনগুলোর মধ্যে ১১০টি ছিল স্ব-পরামর্শভিত্তিক এবং ২৭টি ছিল অনুকরণমূলক কাউন্সেলিং সেশন।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, এআই অনেক সময় ব্যবহারকারীর বাস্তব পরিস্থিতি, অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজন বিবেচনা না করেই সাধারণ পরামর্শ দেয়। ফলে পরামর্শটি শুনতে যুক্তিসংগত মনে হলেও বাস্তব জীবনে তা অকার্যকর কিংবা অনুপযুক্ত হতে পারে।

সহানুভূতির ভাষা থাকলেই কি সত্যিকারের বোঝাপড়া হয়?

এআই চ্যাটবটের একটি বড় আকর্ষণ হলো, এগুলো সহজ ভাষায় উত্তর দিতে পারে এবং অনেক সময় সহানুভূতিশীল ভঙ্গিতে কথা বলে। কেউ নিজের কষ্টের কথা জানালে চ্যাটবট বলতে পারে, ‘আমি বুঝতে পারছি আপনি কতটা কষ্টে আছেন।’

কিন্তু গবেষকদের মতে, সহানুভূতিশীল ভাষা ব্যবহার করা আর একজন মানুষের অনুভূতি বাস্তবে উপলব্ধি করা এক বিষয় নয়। এআই মানুষের মতো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা আবেগের মধ্য দিয়ে যায় না। এটি শেখানো তথ্য ও ভাষার ধরন অনুসরণ করে উত্তর তৈরি করে।

এই কারণে চ্যাটবটের সহানুভূতিশীল উত্তর কখনো কখনো ব্যবহারকারীর মধ্যে এমন ধারণা তৈরি করতে পারে যে, অন্য একজন মানুষ তাঁর পরিস্থিতি গভীরভাবে বুঝতে পারছেন। গবেষকেরা এই প্রবণতাকে ‘প্রতারণামূলক সহানুভূতি’ বা ডিসেপটিভ এমপ্যাথি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

ক্ষতিকর ধারণাকেও সমর্থন করতে পারে এআই

গবেষণায় উঠে আসা আরেকটি উদ্বেগ হলো, কিছু পরিস্থিতিতে এআই ব্যবহারকারীর নেতিবাচক বা ভুল ধারণাকে প্রশ্ন না করে বরং সমর্থন করতে পারে। এতে ব্যক্তি নিজের পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও একপেশে ধারণায় আটকে যেতে পারেন।

উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি মনে করেন যে আশপাশের সবাই তাঁকে অপছন্দ করেন, তাহলে সঠিক সহায়তার জন্য তাঁর অনুভূতি ও বাস্তব পরিস্থিতি আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কিন্তু এআই যদি যথাযথভাবে বিষয়টি যাচাই না করে তাঁর ধারণাকে সমর্থন করে, তাহলে সেই নেতিবাচক বিশ্বাস আরও শক্তিশালী হতে পারে।

এ ছাড়া ব্যবহারকারীর সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয়, সামাজিক অভিজ্ঞতা কিংবা ব্যক্তিগত বাস্তবতা বিবেচনায় না নেওয়ার কারণে পরামর্শে পক্ষপাত দেখা দিতে পারে। ফলে একই উত্তর সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর নাও হতে পারে।

সংকটের মুহূর্তে ভুল পরামর্শের ঝুঁকি বেশি

মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত পরামর্শে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি হলো, সংকটময় পরিস্থিতিতে এআইয়ের সীমাবদ্ধতা। কেউ আত্মহত্যার চিন্তা, তীব্র মানসিক বিপর্যয় কিংবা নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানালে তাঁর পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত ও যথাযথ সহায়তা প্রয়োজন।

কিন্তু এআই সব সময় সংকটের গুরুত্ব সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পারে না। কখনো প্রয়োজনীয় সহায়তার দিকে পাঠাতে ব্যর্থ হতে পারে, আবার কখনো পরিস্থিতির গুরুত্বের তুলনায় অনুপযুক্ত প্রতিক্রিয়া দিতে পারে।

গবেষকদের মতে, যাঁদের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে জ্ঞান ও ডিজিটাল দক্ষতা কম, তাঁরা এআইয়ের ভুল বা অনুপযুক্ত পরামর্শ শনাক্ত করতে বেশি সমস্যায় পড়তে পারেন। অন্যদিকে, যাঁরা ভুল তথ্য বুঝতে পারেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা সংশোধন করতে জানেন, তাঁরা তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকেন।

তাহলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় এআই কি একেবারেই ব্যবহার করা যাবে না?

গবেষকেরা এআইয়ের ব্যবহার পুরোপুরি বাতিল করার কথা বলেননি। বরং তাঁদের মতে, সঠিক সীমার মধ্যে ব্যবহার করা হলে এআই মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে প্রাথমিক তথ্য জানা, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম শেখা, ডায়েরি লেখার অভ্যাস গড়ে তোলা কিংবা নিজের অনুভূতিগুলো গুছিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এআই কাজে লাগতে পারে।

তবে এসব সহায়তা পেশাদার মনোচিকিৎসার বিকল্প নয়। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক কষ্ট, দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত, তীব্র উদ্বেগ কিংবা বিষণ্নতার লক্ষণ দেখা দিলে যোগ্য মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন। আর নিজের বা অন্য কারও নিরাপত্তা নিয়ে তাৎক্ষণিক ঝুঁকি থাকলে জরুরি মানবিক সহায়তা নিতে হবে।

গবেষকেরা এআইভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য আরও কঠোর মূল্যায়ন, সুস্পষ্ট নীতিমালা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁদের মতে, প্রযুক্তির সুবিধা কাজে লাগাতে হলে এর সীমাবদ্ধতাও স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে।

মনের কথা বলুন, তবে নির্ভরতার সীমা বুঝে

এআইয়ের কাছে মনের কথা বলা সহজ হতে পারে। এতে নিজের অনুভূতি গুছিয়ে নেওয়া কিংবা কোনো সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে ভাবার সুযোগও তৈরি হতে পারে। কিন্তু সহানুভূতির ভাষায় দেওয়া প্রতিটি উত্তর যে সঠিক, নিরাপদ কিংবা ব্যক্তির জন্য উপযুক্ত—তা ধরে নেওয়া উচিত নয়।

মানুষের মানসিক অবস্থা বুঝতে শুধু শব্দের অর্থ জানাই যথেষ্ট নয়; তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি এবং কখন পেশাদার সহায়তা প্রয়োজন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান এআই এসব ক্ষেত্রে ভুল করতে পারে।

তাই মনের কষ্ট ভাগ করে নিতে এআইকে সহায়ক মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা গেলেও, গুরুতর মানসিক সংকটে এটিকে একমাত্র ভরসা করে রাখা উচিত নয়। প্রযুক্তি তথ্য দিতে পারে, কিন্তু মানুষের পাশে দাঁড়ানো, পরিস্থিতি গভীরভাবে মূল্যায়ন করা এবং প্রয়োজনমতো দায়িত্ব নিয়ে চিকিৎসাসহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে মানবিক সম্পর্ক ও পেশাদার যত্নের গুরুত্ব অপরিসীম।

Comment / Reply From