২০২৭-এর এআই কতটা ভয়ংকর?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা এখন আর শুধু প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিরাপত্তা ও মানবনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নও। ২০২৭ সালকে সামনে রেখে এআইয়ের সক্ষমতা কত দ্রুত বাড়ছে এবং পরীক্ষার সময় বিভিন্ন সুরক্ষা ব্যবস্থা পাশ কাটানোর ঘটনাগুলো নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ওপেনএআই ও অ্যানথ্রোপিকের সাবেক গবেষক জ্যাকব কক্সনের দাবি, শীর্ষ এআই প্রতিষ্ঠানগুলো পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে ওঠার আগেই আরও শক্তিশালী ‘সুপারইন্টেলিজেন্ট’ প্রযুক্তি তৈরির প্রতিযোগিতায় নেমেছে। তাঁর আশঙ্কা, এই প্রতিযোগিতা ভবিষ্যতে মানবজাতিকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘দ্য ডেইলি শো’তে সঞ্চালক জন স্টুয়ার্টের সঙ্গে আলোচনায় এবং পরে নিউ ইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের একটি নীতিনির্ধারণী শুনানিতে অংশ নিয়ে কক্সন এআইয়ের অনিয়ন্ত্রিত বিকাশে সরকারি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানান।
কেন এতটা উদ্বিগ্ন কক্সন?
কক্সন জানান, ওপেনএআইয়ে প্রায় তিন বছর গবেষক হিসেবে কাজ করার পর তিনি অ্যানথ্রোপিকে যোগ দেন। সেখানে কাজের সময় দুটি বিষয় তাঁকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়েছে।
প্রথমটি হলো এআই মডেলগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির গতি। তাঁর মতে, অল্প সময়ের ব্যবধানে নতুন মডেলগুলো আগের তুলনায় এমনভাবে উন্নত হচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করছে।
দ্বিতীয় বিষয়টি হলো এআই মডেলের নিরাপত্তা পরীক্ষা চলাকালে সামনে আসা কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ। কক্সনের ভাষ্য, মডেলগুলোর বাড়তে থাকা সক্ষমতার সঙ্গে এসব ঘটনা একসঙ্গে বিবেচনা করলে ঝুঁকির মাত্রা আরও স্পষ্ট হয়।
আগামী বছর বা ২০২৭ সালের শুরুতে প্রশিক্ষিত হতে পারে এমন মডেলগুলোর সক্ষমতা নিয়ে তিনি সতর্ক করে বলেন, সেগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী হতে পারে। তাঁর মতে, এর সঙ্গে সাম্প্রতিক নিরাপত্তা ঘটনাগুলো মিলিয়ে দেখলে পরিস্থিতিকে ‘ভয়ংকর’ বলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
এআই মডেল কি সুরক্ষা ব্যবস্থা পাশ কাটাতে পারে?
কক্সনের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে রয়েছে ওপেনএআইয়ের একটি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরীক্ষার ঘটনা।
সংবাদমাধ্যম নিউজউইকের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত জুলাইয়ে সাইবার নিরাপত্তা মূল্যায়নের সময় কিছু এআই মডেল নির্ধারিত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সীমা অতিক্রম করেছিল। পরীক্ষার পরিবেশে থাকা মডেলগুলো অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি করে এবং গবেষণা পরিবেশের বাইরে থাকা একটি এআই প্ল্যাটফর্মের সিস্টেমে প্রবেশের চেষ্টা করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ওপেনএআই ঘটনাটিকে এআই নিরাপত্তার জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখেছে। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সুরক্ষাকবচের অভাবে এআই মডেল কতটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে পারে এবং প্রত্যাশার বাইরে গিয়ে পদক্ষেপ নিতে পারে, এই ঘটনা তার একটি উদাহরণ।
এর পর নিরাপত্তা পরীক্ষা, মডেলের ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং স্যান্ডবক্স পরিবেশ আরও কঠোর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
কক্সনের মতে, একটি এআই এজেন্ট যদি নিজে থেকে এমন পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী মডেলের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
‘কিল সুইচ’ কি যথেষ্ট?
৫ অক্টোবর নিউ ইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের শুনানিতে উপস্থিত হয়ে কক্সন নীতিনির্ধারকদের সতর্ক করেন। তাঁর বক্তব্য, এখনো এমন কোনো নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি তৈরি হয়নি, যার মাধ্যমে উন্নত এআই ব্যবস্থাকে সব পরিস্থিতিতে নিশ্চিতভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
কক্সন আরও বলেন, জরুরি মুহূর্তে এআই বন্ধ করে দেওয়ার জন্য ‘কিল সুইচ’ বা তাৎক্ষণিক বন্ধের ব্যবস্থা থাকলেও সেটিকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে দেখা উচিত নয়।
তাঁর মতে, ফ্রন্টিয়ার এআই—অর্থাৎ সবচেয়ে উন্নত ও শক্তিশালী মডেলগুলোর উন্নয়নের গতি কিছুটা কমানো এবং একই সঙ্গে নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে।
নিউ ইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের স্পিকার জুলি মেনিন এআই নিয়ন্ত্রণে নতুন আইনি কাঠামো এবং হুইসেলব্লোয়ারদের সুরক্ষার প্রস্তাবও তুলেছেন।
ওয়াশিংটনও দিচ্ছে গুরুত্ব
এআইয়ের সম্ভাব্য প্রভাব ও নিরাপত্তা নিয়ে মার্কিন ফেডারেল পর্যায়েও আলোচনা বাড়ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স ফোর্স’ বা এসআইএফ নামে একটি ফেডারেল টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন।
এই উদ্যোগে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা, ফেডারেল ট্রেড কমিশন এবং প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে এআইকে ঘিরে জাতীয় নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বিষয়গুলোকে আরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অর্থাৎ এআই এখন কেবল প্রযুক্তি কোম্পানির গবেষণাগারের বিষয় নয়; এটি ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
এআই কি মানুষের চাকরির বড় অংশ নিয়ে নেবে?
কক্সনের আশঙ্কার আরেকটি দিক অর্থনীতিকে ঘিরে। তাঁর মতে, ভবিষ্যতে প্রচলিত অর্থে বহু ধরনের চাকরি আর নাও থাকতে পারে।
‘দ্য ডেইলি শো’তে তিনি বলেন, এআই নির্মাতারা এমন একটি ভবিষ্যতের কথাই ভাবছেন, যেখানে মানুষের দৈহিক ও মানসিক শ্রমের বড় অংশ স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি দিয়ে সম্পন্ন হবে।
তাহলে সেই অর্থনৈতিক উৎপাদনের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে কীভাবে পৌঁছাবে—এই প্রশ্নও সামনে আসবে। কক্সনের আলোচনায় এর সম্ভাব্য একটি পথ হিসেবে ‘ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম’-এর মতো ব্যবস্থার কথা উঠে আসে। অর্থাৎ প্রযুক্তি থেকে তৈরি অর্থনৈতিক সম্পদের একটি অংশ নিয়মিতভাবে মানুষের মধ্যে বণ্টনের ধারণা।
আসল ঝুঁকি কোথায়?
এআই নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি শুধু মডেল কতটা ‘বুদ্ধিমান’ হবে, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রশ্ন হচ্ছে—এর সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে মানুষের নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর থাকবে।
একদিকে দ্রুত উন্নত হচ্ছে এআইয়ের সমস্যা সমাধান, পরিকল্পনা ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করার ক্ষমতা। অন্যদিকে সেই প্রযুক্তি কীভাবে সীমার মধ্যে রাখা হবে, ভুল সিদ্ধান্ত কীভাবে ঠেকানো হবে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর নিয়ন্ত্রণ থাকবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
তাই ২০২৭ সালেই এআই ‘ভয়ংকর’ হয়ে উঠবে কি না, সেটি নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে কক্সনের মতো সাবেক গবেষকদের সতর্কবার্তা অন্তত একটি বিষয় সামনে এনেছে—এআই যত দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তা, আইন এবং মানবিক তদারকিও দ্রুত শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
কারণ প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ শুধু মডেল কতটা শক্তিশালী হবে, তা দিয়ে নির্ধারিত হবে না; সেই শক্তির ওপর মানুষ কতটা কার্যকর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!