মুখে পানি নিয়েও গিলেন না ফুটবলাররা! জানুন চমকপ্রদ বৈজ্ঞানিক কারণ
ফুটবল ম্যাচের সময় প্রায়ই দেখা যায়, কোনো খেলোয়াড় বোতল থেকে পানি বা স্পোর্টস ড্রিংকের এক চুমুক নিয়ে কয়েক সেকেন্ড মুখে কুলি করেন, তারপর তা গিলে না ফেলে মাঠেই ফেলে দেন। অনেকের কাছে এটি পানি অপচয় মনে হলেও, বাস্তবে এর পেছনে রয়েছে ক্রীড়াবিজ্ঞানে স্বীকৃত একটি কার্যকর কৌশল।
শুধু ফুটবলার নন, ম্যারাথন দৌড়বিদ, সাইক্লিস্ট এবং দীর্ঘ সময় উচ্চমাত্রার শারীরিক পরিশ্রম করা অনেক ক্রীড়াবিদও এই পদ্ধতি অনুসরণ করেন। এর নাম ‘কার্বোহাইড্রেট মাউথ রিন্স’ (Carbohydrate Mouth Rinse)।
কী এই কার্বোহাইড্রেট মাউথ রিন্স?
এটি এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে কার্বোহাইড্রেটযুক্ত স্পোর্টস ড্রিংক বা পানীয় কয়েক সেকেন্ড মুখে রেখে কুলি করা হয়, কিন্তু তা গিলে ফেলা হয় না। এরপর পানীয়টি মুখ থেকে ফেলে দেওয়া হয়।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এই কৌশল সাময়িকভাবে খেলোয়াড়ের মনোযোগ, সতর্কতা এবং পারফরম্যান্স বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।
কীভাবে কাজ করে এই কৌশল?
মানুষের মুখের ভেতরে এমন কিছু বিশেষ রিসেপ্টর রয়েছে, যা কার্বোহাইড্রেটের উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারে। মুখে কার্বোহাইড্রেটযুক্ত পানীয় প্রবেশ করলে এসব রিসেপ্টর মস্তিষ্কে দ্রুত সংকেত পাঠায়।
এই সংকেত মস্তিষ্কের সেই অংশকে সক্রিয় করে, যা উদ্দীপনা, মনোযোগ এবং মোটর কন্ট্রোলের সঙ্গে সম্পর্কিত। মোটর কন্ট্রোল আমাদের শরীরের চলাফেরা ও পেশির সমন্বয় নিয়ন্ত্রণ করে।
ফলে শরীর বাস্তবে অতিরিক্ত শক্তি না পেলেও মস্তিষ্ক কিছু সময়ের জন্য মনে করে, শক্তির সরবরাহ আসছে। এর ফলে খেলোয়াড় সাময়িকভাবে আরও সতেজ ও মনোযোগী অনুভব করতে পারেন।
পানীয়টি গিলে ফেলেন না কেন?
ম্যাচ চলাকালে ফুটবলারদের বিরতির সময় খুবই সীমিত। এ সময় বেশি পানি বা স্পোর্টস ড্রিংক পান করলে পেট ভারী লাগতে পারে, অস্বস্তি হতে পারে কিংবা দ্রুত দৌড়ানোর সময় সমস্যা তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া পানীয় গিলে ফেললে সেটি হজম হয়ে শরীরে কাজ করতে কিছুটা সময় লাগে। কিন্তু মুখে কয়েক সেকেন্ড কুলি করলেই মস্তিষ্কে সংকেত পৌঁছে যায় প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। তাই দ্রুত পারফরম্যান্সে ইতিবাচক প্রভাব পাওয়ার জন্য অনেক খেলোয়াড় এই কৌশল ব্যবহার করেন।
২০১৮ বিশ্বকাপে আলোচনায় আসে এই পদ্ধতি
যদিও কার্বোহাইড্রেট মাউথ রিন্স বহু বছর ধরেই ব্যবহৃত হচ্ছে, তবে ২০১৮ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে।
সেই সময় ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন, পর্তুগালের তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোসহ বেশ কয়েকজন ফুটবলারকে ম্যাচ চলাকালে মুখে স্পোর্টস ড্রিংক নিয়ে কুলি করে ফেলে দিতে দেখা যায়। এরপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে দর্শকদের কৌতূহল আরও বাড়ে।
এটি কি পানির বিকল্প?
একেবারেই নয়।
কার্বোহাইড্রেট মাউথ রিন্স কখনোই শরীরের পানিশূন্যতা দূর করতে পারে না। খেলোয়াড়দের ঘামের মাধ্যমে হারানো পানি ও ইলেকট্রোলাইটের ঘাটতি পূরণ করতে নিয়মিত পানি বা ইলেকট্রোলাইটসমৃদ্ধ পানীয় পান করতেই হয়।
সাধারণত ম্যাচ শুরুর আগে, বিরতির সময়, ম্যাচ শেষে এবং গরম আবহাওয়ায় নির্ধারিত হাইড্রেশন ব্রেক বা কুলিং ব্রেক-এ ফুটবলাররা পর্যাপ্ত পানি পান করেন।
সাধারণ মানুষের জন্য কি প্রয়োজন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কৌশল মূলত দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমাত্রার ব্যায়াম বা প্রতিযোগিতামূলক খেলাধুলার জন্য কার্যকর।
দৈনন্দিন হাঁটা, হালকা ব্যায়াম কিংবা সাধারণ শারীরিক কর্মকাণ্ডে এর তেমন কোনো প্রয়োজন নেই। তাই সাধারণ মানুষের জন্য পর্যাপ্ত পানি পান এবং সুষম খাদ্য গ্রহণই যথেষ্ট।
ফুটবল মাঠে খেলোয়াড়দের মুখে পানি বা স্পোর্টস ড্রিংক নিয়ে কুলি করে ফেলে দিতে দেখলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এটি পানি অপচয় নয়; বরং পারফরম্যান্স উন্নত করার জন্য ক্রীড়াবিজ্ঞানে স্বীকৃত একটি কৌশল। তবে এর পাশাপাশি শরীরের পানির ভারসাম্য বজায় রাখতে পর্যাপ্ত পানি পান করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!