মৃতরা কি আমাদের কথা শুনতে পান? ইসলামের ব্যাখ্যা
মৃত্যুর পর মানুষের জীবন দুনিয়ার জীবন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, মৃত্যুর পর মানুষ ‘আলমে বারজাখে’ প্রবেশ করে। এই অবস্থায় মৃত ব্যক্তি জীবিতদের কথা শুনতে বা দেখতে পান কি না—এ নিয়ে ইসলামী জ্ঞানীদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা ও মতভেদ রয়েছে।
অধিকাংশ আলেমের মতে, মৃত ব্যক্তি দুনিয়ার মানুষের সব কথা স্বাভাবিকভাবে শুনতে বা সবকিছু দেখতে পান—এমনটি বলা যায় না। তবে আল্লাহ তাআলা চাইলে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে মৃতদের শোনার বা কোনো বিষয় সম্পর্কে অবগত হওয়ার সুযোগ দিতে পারেন। বিশেষ করে কবরের কাছে গিয়ে সালাম ও দোয়া করার বিষয়টি হাদিসে গুরুত্বের সঙ্গে এসেছে।
দাফনের পর জুতার শব্দ শোনার হাদিস
হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি সহিহ হাদিসে এসেছে, কোনো ব্যক্তিকে কবরে দাফন করার পর তার সঙ্গীরা যখন ফিরে যায়, তখন মৃত ব্যক্তি তাদের জুতার শব্দ শুনতে পায়। (সহিহ বুখারি: ১৩৭৪; সহিহ মুসলিম: ২৮৭০)
এ হাদিস থেকে অনেক আলেম মনে করেন, আল্লাহ তাআলা বিশেষ পরিস্থিতিতে মৃত ব্যক্তিকে জীবিতদের কিছু বিষয় শোনার ক্ষমতা দিতে পারেন।
বদরের নিহতদের রাসুলের সম্বোধন
বদরের যুদ্ধে নিহত মুশরিকদের উদ্দেশে রাসুলুল্লাহ (সা.) কথা বলেছিলেন। তখন হজরত ওমর (রা.) জানতে চেয়েছিলেন, কীভাবে এমন মৃত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে?
জবাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) জানান, তিনি যা বলছেন, তারা তা শুনতে পাচ্ছে; তবে তারা তাঁর কথার জবাব দিতে পারছে না। (সহিহ বুখারি: ১৩৭০; সহিহ মুসলিম: ২৮৭৩)
এই হাদিসকে মৃতদের শ্রবণক্ষমতার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে উল্লেখ করেছেন অনেক আলেম।
কবরের পাশে সালাম দিলে কি মৃত ব্যক্তি তা জানতে পারেন?
কবর জিয়ারতের সময় সালাম দেওয়ার বিষয়ে হাদিসে বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের কবরবাসীদের সালাম জানাতে শিক্ষা দিয়েছেন।
এ কারণে আলেমদের একটি বড় অংশ মনে করেন, কবরের পাশে গিয়ে সালাম ও দোয়া করলে মৃত ব্যক্তি আল্লাহর ইচ্ছায় তা উপলব্ধি করতে পারেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে মৃত ব্যক্তি নিজের ক্ষমতায় পৃথিবীর সর্বত্র ঘটে যাওয়া সবকিছু দেখতে বা শুনতে পারেন।
হজরত আয়েশা (রা.)-এর ভিন্ন ব্যাখ্যা
এ বিষয়ে সাহাবিদের মধ্যেও ভিন্ন মত পাওয়া যায়। উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) মনে করতেন, মৃত ব্যক্তিরা সাধারণ নিয়মে জীবিতদের কথা শুনতে পান না।
তিনি কোরআনের কয়েকটি আয়াতকে এর দলিল হিসেবে উল্লেখ করতেন। যেমন—
‘নিশ্চয়ই আপনি মৃতদের শোনাতে পারবেন না।’
—সুরা আন-নামল: ৮০
আরেক আয়াতে বলা হয়েছে—
‘আপনি কবরে থাকা ব্যক্তিদের শোনাতে পারবেন না।’
—সুরা ফাতির: ২২
হজরত আয়েশা (রা.) বদরের ঘটনার ব্যাখ্যায় মনে করতেন, সেটি ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিশেষ একটি মুজিজা। অর্থাৎ ওই ঘটনার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা নিহতদের বিশেষভাবে শোনার সুযোগ দিয়েছিলেন।
আলেমদের সমন্বিত ব্যাখ্যা কী?
পরবর্তী সময়ের অনেক আলেম উভয় ধরনের দলিলের মধ্যে সমন্বয়ের চেষ্টা করেছেন। তাদের ব্যাখ্যা হলো—মৃত ব্যক্তি দুনিয়ার মানুষের মতো স্বাধীনভাবে সবকিছু শোনা বা দেখার ক্ষমতা রাখেন না। তবে আল্লাহ তাআলা চাইলে নির্দিষ্ট কোনো পরিস্থিতিতে তাকে কোনো বিষয় শোনাতে বা জানাতে পারেন।
অর্থাৎ কবরের কাছে গিয়ে সালাম দেওয়া, দোয়া করা কিংবা মৃত ব্যক্তিকে উদ্দেশ করে কথা বলার বিষয়টি একেবারে অস্বীকার করা হয় না। একই সঙ্গে এমন ধারণাও সঠিক নয় যে মৃত ব্যক্তি সবসময় দূর-দূরান্তের মানুষের কথাবার্তা শুনছেন কিংবা পৃথিবীর সব ঘটনা দেখছেন।
কবর জিয়ারতে কীভাবে সালাম দেবেন?
রাসুলুল্লাহ (সা.) কবরবাসীদের সালাম দেওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। বলা যায়—
السَّلَامُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُسْلِمِينَ
উচ্চারণ:
আসসালামু আলাইকুম আহলাদ দিয়ারে মিনাল মুমিনিনা ওয়াল মুসলিমিনা।
অর্থ:
‘হে মুমিন ও মুসলিম কবরবাসী! আপনাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।’
(সহিহ মুসলিম: ৯৭৫)
মৃত স্বজনদের জন্য কী করা উচিত?
মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে অজানা বিষয় বা অতিরঞ্জিত ধারণার পরিবর্তে ইসলামে শেখানো আমলগুলোর প্রতি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। প্রয়াত স্বজনদের জন্য দোয়া ও ইস্তিগফার করা, তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সদকা করা উত্তম আমল হিসেবে বিবেচিত হয়।
সবশেষে বলা যায়, মৃতরা জীবিতদের সব কথা ও সবকিছু স্বাভাবিকভাবে দেখতে বা শুনতে পান—এমন বিশ্বাসের নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই। তবে সহিহ হাদিসে কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে মৃতদের শোনার বিষয়টি এসেছে। তাই এ বিষয়টি গায়েবের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে গ্রহণ করে কোরআন-হাদিসে প্রমাণিত বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উত্তম।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!