দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, সন্ধ্যায় ফাস্টফুড দোকানি রুবেল
স্বপ্ন পূরণের পথে কাজকে কখনো ছোট করে দেখেননি যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী রুবেল। দিনের আলোয় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে ব্যস্ত, আর সন্ধ্যা নামলেই বসেন নিজের ফাস্টফুড দোকানের কাউন্টারে। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের খরচ চালানো, পরিবারকে সহায়তা করা এবং আত্মনির্ভরশীল হওয়ার লক্ষ্যেই তার এই উদ্যোগ।
আত্মসম্মান থেকেই কাজের শুরু
রুবেলের পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ নয়। তবুও নিজের প্রয়োজন মেটাতে পরিবারের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে চাননি তিনি। তার কাছে কাজের মূল উদ্দেশ্য শুধু অর্থ উপার্জন নয়, বরং নিজের আত্মসম্মান ধরে রেখে নিজের দায়িত্ব নিজে পালন করা।
তিনি বলেন, নিজের খরচ নিজে চালানোর পাশাপাশি পরিবারকেও সামান্য হলেও সহযোগিতা করতে চান। সেই ভাবনা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন।
টিউশনি থেকে ফাস্টফুডের দোকান
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় নিজের খরচ চালাতে আগে টিউশনি করতেন রুবেল। কিন্তু টিউশনি থেকে পাওয়া আয় দিয়ে সব ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছিল। তখনই ভাবতে শুরু করেন, পড়াশোনার পাশাপাশি এমন কোনো কাজ করা যায় কি না, যেখান থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি আয় করা সম্ভব।
সেই ভাবনা থেকেই ছোট পরিসরে ফাস্টফুডের দোকান দেওয়ার পরিকল্পনা করেন তিনি। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে পাশে দাঁড়ান তার বড় ভাই মিলন। রুবেলের ভাষায়, বড় ভাই নিঃস্বার্থভাবে তাকে সহযোগিতা করেছেন এবং তার প্রতি এই কৃতজ্ঞতা কখনো শেষ হওয়ার নয়।
ক্লাস শেষে দোকানে
রুবেলের প্রতিদিনের জীবন বেশ ব্যস্ত। সকাল সাড়ে ৯টা ৩০ মিনিট থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করেন। এরপর সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সামলান নিজের দোকান।
কোনো দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস আগে শেষ হলে সেদিন একটু আগেই দোকান খুলে দেন। টিউশনি করার যে সময়টি আগে ব্যয় হতো, সেটিও এখন দোকানের কাজে ব্যবহার করেন। এভাবেই পড়াশোনা ও ব্যবসা—দুটোকেই নিজের সময়সূচির মধ্যে সামঞ্জস্য করে নিয়েছেন তিনি।
পরিশ্রমে ক্লান্তি, তবু আত্মবিশ্বাস বেশি
একসঙ্গে পড়াশোনা ও ব্যবসা সামলাতে শারীরিক পরিশ্রম করতে হয়। দিনের বড় একটা সময় ব্যস্ত থাকার কারণে ক্লান্তিও আসে। তবে রুবেলের দাবি, এতে তার পড়াশোনায় বড় ধরনের কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে না।
বরং দোকানে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। তার কাছে কোনো কাজই ছোট নয়। কাজের কারণে আত্মসম্মান কমেনি, বরং নিজের প্রতি সম্মান আরও বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি।
সহপাঠী ও শিক্ষকদের সমর্থন
রুবেলের এই উদ্যোগে বন্ধু ও সহপাঠীদের কাছ থেকেও পেয়েছেন ইতিবাচক সাড়া। কেউ তাকে কটূক্তি করেনি; বরং অনেকেই উৎসাহ দিয়েছেন। শিক্ষকরাও তার পরিশ্রম ও উদ্যোগকে প্রশংসার চোখে দেখছেন।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে এখনো এ উদ্যোগের জন্য বিশেষ কোনো সুযোগ-সুবিধা পাননি বলে জানিয়েছেন তিনি।
নিজের খরচের পাশাপাশি পরিবারকেও সহায়তা
দোকান থেকে পাওয়া আয় দিয়ে রুবেল নিজের দৈনন্দিন খরচ মেটান। পাশাপাশি পরিবারের জন্যও কিছুটা অর্থ দিতে পারেন। এতে নিজের ওপর থাকা আর্থিক চাপ কমার পাশাপাশি পরিবারকেও সহযোগিতা করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তার কাছে এই আয়ের গুরুত্ব শুধু টাকার অঙ্কে নয়; নিজের পরিশ্রমে উপার্জন করার অনুভূতিটাই তার কাছে বড়।
লক্ষ্য বিসিএস, স্বপ্ন কৃষি নিয়েও
ফাস্টফুডের দোকান রুবেলের চূড়ান্ত গন্তব্য নয়। তার বড় স্বপ্ন একজন বিসিএস ক্যাডার হওয়া। পাশাপাশি সুযোগ পেলে কৃষি খাতেও কাজ করার আগ্রহ রয়েছে তার।
তিনি মনে করেন, বর্তমানের এই কাজ তাকে ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিক্ষা দিচ্ছে—দায়িত্ব নেওয়া, পরিশ্রম করা, সময়ের মূল্য বোঝা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে চলা।
‘কোনো কাজই তুচ্ছ নয়’
অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য রুবেলের বার্তা, কোনো সৎ কাজকে ছোট করে দেখা উচিত নয়। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করলে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
তার কথায়, “কোনো কাজই তুচ্ছ নয়। তাই কাজ করি, দেশ গড়ি।”
রুবেলের গল্প তাই শুধু একজন শিক্ষার্থীর ফাস্টফুডের দোকান চালানোর গল্প নয়। এটি আত্মসম্মান, পরিশ্রম ও স্বপ্নকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া এক তরুণের গল্প। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুম থেকে দোকানের কাউন্টার—দুই জায়গাতেই নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করে চলেছেন তিনি।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!