যে ৯ কারণে ঘর থেকে বরকত কমে যেতে পারে
ইসলামের দৃষ্টিতে বরকত মানে শুধু অর্থ-সম্পদের প্রাচুর্য নয়। বরং অল্পের মধ্যে তৃপ্তি, জীবনে কল্যাণ, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভালোবাসা, সুস্থতা ও মানসিক প্রশান্তিও বরকতের অংশ। অনেক সময় বাহ্যিকভাবে স্বচ্ছলতা থাকলেও পরিবারে অশান্তি, কলহ কিংবা অস্থিরতা লেগেই থাকে।
ইসলামী শিক্ষা অনুযায়ী মানুষের ঈমান, আমল, উপার্জন এবং দৈনন্দিন আচরণের সঙ্গে পারিবারিক জীবনের শান্তি ও বরকতের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাই কিছু অভ্যাস সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
যেসব কারণে ঘরের বরকত কমে যেতে পারে
১. ঘরে ইবাদত ও আল্লাহর জিকিরের পরিবেশ না থাকা
নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত ও জিকির থেকে ঘর দূরে থাকলে আধ্যাত্মিক পরিবেশ দুর্বল হয়ে পড়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) জিকিরকারী ও জিকিরহীন ব্যক্তির উদাহরণ জীবিত ও মৃতের সঙ্গে তুলনা করেছেন। (সহিহ বুখারি: ৬৪০৭)
তাই পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত ও জিকিরের অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।
২. হারাম বা সন্দেহজনক উপার্জন
সুদ, ঘুষ, প্রতারণা, দুর্নীতি কিংবা অন্যায় পন্থায় অর্জিত অর্থ ইসলামে নিষিদ্ধ। হারাম উপার্জন বাহ্যিকভাবে সম্পদ বাড়ালেও তাতে কল্যাণ থাকে না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্র জিনিস ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করেন না। (সহিহ মুসলিম: ১০১৫)
৩. আল্লাহর অবাধ্যতা ও পাপাচার
ইসলামী শিক্ষায় ঈমান ও তাকওয়াকে আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে, কোনো জনপদের মানুষ ঈমান ও তাকওয়া অবলম্বন করলে তাদের জন্য আকাশ ও পৃথিবীর বরকতের দ্বার খুলে দেওয়া হতো। (সুরা আল-আ‘রাফ: ৯৬)
তাই গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা এবং নিয়মিত তওবা করা গুরুত্বপূর্ণ।
৪. আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট করা
রাগ, অভিমান, অহংকার বা পারিবারিক বিরোধের কারণে আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা ইসলামে সমর্থিত নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার সঙ্গে রিজিকের প্রশস্ততার সম্পর্কের কথা বলেছেন। (সহিহ বুখারি: ৫৯৮৬)
তাই ভুল বোঝাবুঝি হলেও সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন না করে তা মীমাংসার চেষ্টা করা উচিত।
৫. আল্লাহর নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা
পরিবার, স্বাস্থ্য, জীবিকা কিংবা অন্য নিয়ামত পাওয়ার পরও সবসময় শুধু কী নেই—সেদিকে নজর দিলে মনের প্রশান্তি কমে যেতে পারে। কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে তিনি নিয়ামত বাড়িয়ে দেবেন। (সুরা ইবরাহিম: ৭)
তাই অপ্রাপ্তির পাশাপাশি প্রাপ্ত নিয়ামতের জন্যও আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা উচিত।
৬. ব্যবসা-বাণিজ্যে মিথ্যা ও প্রতারণা
পণ্যের ত্রুটি গোপন করা, মিথ্যা তথ্য দেওয়া কিংবা ক্রেতাকে ঠকানোর মাধ্যমে অর্জিত অর্থে বরকত থাকে না। হাদিসে বলা হয়েছে, ক্রেতা ও বিক্রেতা সত্য বললে এবং পণ্যের ত্রুটি স্পষ্ট করলে তাদের লেনদেনে বরকত দেওয়া হয়; আর মিথ্যা ও গোপনীয়তার কারণে সেই বরকত নষ্ট হয়। (সহিহ বুখারি: ২০৭৯)
৭. অপচয় ও অপ্রয়োজনীয় খরচ
প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত খরচ করা এবং অযথা সম্পদ নষ্ট করার অভ্যাস সংসারে আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে। কোরআনে অপচয় থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (সুরা আল-আ‘রাফ: ৩১)
তাই আয় অনুযায়ী পরিকল্পিতভাবে খরচ করা এবং প্রয়োজন ও বিলাসিতার মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি।
৮. ঘরে প্রবেশের সময় সালাম না দেওয়া
ইসলামে ঘরে প্রবেশের সময় সালাম দেওয়ার শিক্ষা রয়েছে। কোরআনে ঘরে প্রবেশের সময় সালামকে ‘বরকতময় ও পবিত্র অভিবাদন’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। (সুরা আন-নূর: ৬১)
পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সালামের প্রচলন পারস্পরিক ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য বাড়াতেও সহায়ক।
৯. খাবারের শুরুতে আল্লাহর নাম স্মরণ না করা
খাবার শুরুর আগে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ আদব। হাদিসে এসেছে, ব্যক্তি ঘরে প্রবেশ ও খাবারের সময় আল্লাহকে স্মরণ করলে শয়তান তার সঙ্গে থাকার সুযোগ পায় না। (সহিহ মুসলিম: ২০১৮)
পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে খাবার গ্রহণ করাও পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করতে পারে এবং হাদিসে একসঙ্গে খাবার গ্রহণের উৎসাহ পাওয়া যায়। (আবু দাউদ: ৩৭৬৪)
ঘরে বরকত বাড়াতে কী করবেন?
ইস্তিগফার ও তওবা করুন
নিয়মিত আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ আমল। সুরা নুহে ইস্তিগফারের সঙ্গে বৃষ্টি, সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির কল্যাণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। (সুরা নুহ: ১০-১২)
দিনের শুরুটা ভালো কাজে করুন
ফজরের পর সময়কে অলসতায় না কাটিয়ে নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির এবং বৈধ ও উপকারী কাজে দিনের সূচনা করা উত্তম। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর উম্মতের সকালের কাজে বরকতের জন্য দোয়া করেছেন। (আবু দাউদ: ২৬০৬)
হালাল উপার্জন ও সদকার প্রতি গুরুত্ব দিন
উপার্জনের ক্ষেত্রে সততা বজায় রাখা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী দান-সদকা করা ইসলামী জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সম্পদের পরিমাণের চেয়ে তা কীভাবে অর্জন ও ব্যয় করা হচ্ছে—সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সবশেষে, বরকত শুধু বেশি অর্থের নাম নয়; বরং অল্পের মধ্যে কল্যাণ, তৃপ্তি, সুস্থতা, পারিবারিক ভালোবাসা ও মানসিক প্রশান্তিও বরকতের প্রকাশ। তাই ঘরে ইবাদতের পরিবেশ তৈরি করা, হালাল উপার্জন করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, অপচয় ও প্রতারণা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা জরুরি।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!