যেভাবে গড়ে উঠতে পারে শিশুর বই পড়ার অভ্যাস 📚
বই মানুষের জ্ঞান, কল্পনা ও চিন্তার জগৎকে বিস্তৃত করে। ছোটবেলা থেকেই যদি শিশুর মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করা যায়, তাহলে তা তার চিন্তাভাবনা, সৃজনশীলতা এবং মানসিক বিকাশে বড় ভূমিকা রাখে। পরিবার ও সামাজিক পরিবেশ এই অভ্যাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বগুড়ার তরুণ কবি নিখিল নওশাদ ও সান্ত্বনা খাতুন দম্পতির একটি ব্যতিক্রমী ঘটনার কথা অনেকেই জানেন। ২০২২ সালে তাঁদের বিয়েতে দেনমোহর হিসেবে টাকা বা স্বর্ণ নয়, বরং ১০১টি বই নির্ধারণ করা হয়েছিল। হবু বধূ সান্ত্বনা খাতুন তাঁর পছন্দের বইয়ের একটি তালিকাও দিয়েছিলেন। সেই তালিকা অনুযায়ী বিভিন্ন বইয়ের দোকান ঘুরে বই সংগ্রহ করেছিলেন নিখিল নওশাদ।
তবে কাবিননামায় সরাসরি বইকে দেনমোহর হিসেবে উল্লেখ করতে কাজি আপত্তি জানান। পরে বইয়ের সংখ্যার ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট অর্থমূল্য উল্লেখ করে সেটি দেনমোহর হিসেবে কাবিননামায় লেখা হয়। এভাবে বিয়ের আনন্দঘন মুহূর্তে অন্য উপহারের বদলে বই গ্রহণ করেছিলেন সান্ত্বনা খাতুন।
অতীতেও বিয়েতে বই উপহার দেওয়ার একটি সংস্কৃতি ছিল। অনেক পরিবারে এখনও বিয়েতে বই উপহার দেওয়ার প্রচলন দেখা যায়। অনেক সময় এই উপহারই ভবিষ্যতে পাঠাভ্যাস তৈরির সূচনা করে।
শৈশবের একটি স্মৃতি এমনই উদাহরণ তুলে ধরে। অনেকের বাড়িতেই আগে বই রাখার জন্য আলাদা তাক থাকত না। কাপড়ের আলমারির এক কোণে যত্ন করে রাখা থাকত বই। সেসব বই সাধারণত বিশেষ উপলক্ষে পাওয়া উপহার। অনেক সময় শিশুদের বই ধরতেও দেওয়া হতো না, যাতে বই নষ্ট না হয়।
কিন্তু একসময় সেই বই-ই হয়ে উঠত নতুন জগতের দরজা। যেমন, ক্লাস এইটের পরীক্ষা শেষে মায়ের আলমারিতে রাখা একটি বই হাতে পেয়ে কেউ প্রথমবার পড়তে পারে বিমল মিত্রের ‘সাহেব বিবি গোলাম’। এরপর ধীরে ধীরে পাঠের জগৎ প্রসারিত হতে থাকে—শংকরের ‘চৌরঙ্গী’, আশাপূর্ণা দেবীর ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’, ‘সুবর্ণলতা’, ‘বকুলকথা’, কিংবা পরবর্তীতে মুহম্মদ জাফর ইকবাল, হুমায়ূন আহমেদ, আনিসুল হক বা জহির রায়হানের বিভিন্ন বই।
এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে—একটি বই কখনো কখনো নতুন পাঠকের জন্ম দেয়। অনেক সময় উপহার পাওয়া বই থেকেই গড়ে ওঠে আজীবনের পাঠাভ্যাস।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪০ লাখ নতুন বই প্রকাশিত হয়। আর বাংলা একাডেমির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে গত বছরের অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে ৩ হাজার ২৯৯টি নতুন বই। এর আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৭৩০।
তবে বই প্রকাশের সংখ্যা বাড়লেও বই পড়ার প্রবণতা আগের মতো নেই বলে অভিযোগ প্রকাশকদের। অনেকেই এখন স্মার্টফোনে বেশি সময় ব্যয় করছেন। ফলে বই কেনা ও পড়ার আগ্রহ কমে যাচ্ছে।
এ অবস্থায় নতুন প্রজন্মকে বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করতে পরিবার ও সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উৎসব কিংবা বিশেষ দিনে বই উপহার দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।
ঈদে বড়রা সাধারণত ছোটদের সালামি দেন। চাইলে সেই সালামির একটি অংশ বই উপহার হিসেবে দেওয়া যেতে পারে। এমনকি সালামির খামের সঙ্গে একটি বই যোগ করলেও শিশুদের মধ্যে বইয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া অমর একুশে বইমেলা বা অনলাইন বইয়ের দোকান থেকেও সহজেই প্রিয়জনের জন্য বই কেনা সম্ভব। প্রথমা, রকমারি, বাতিঘর কিংবা অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে বই অর্ডার করে সরাসরি উপহার হিসেবে পাঠানো যায়।
ঈদের ছুটিতে অনেকেরই কিছুটা অবসর সময় থাকে। এই সময়টাকে বই পড়ার জন্য কাজে লাগানো যেতে পারে। উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি যদি বই উপহার দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তাহলে নতুন পাঠক তৈরি হবে এবং বইয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে।
কারণ বই এক ধরনের আশ্চর্য দূরবিনের মতো—যার মাধ্যমে মানুষ দেখতে পারে অচেনা পৃথিবীর নতুন রূপ।
Comment / Reply From
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!