রোগা হয়েও নিজেকে মোটা মনে হয় যে অসুখে
“আমি মোটা হয়ে যাচ্ছি”—এমন অভিযোগ প্রায়ই করতেন ঢাকার এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সুমাইয়া (ছদ্মনাম)। অথচ বাস্তবে তাঁর ওজন ছিল স্বাভাবিকের চেয়েও কম। পরিবারের সদস্যরা খেতে বললে তিনি নানা অজুহাতে এড়িয়ে যেতেন। ধীরে ধীরে খাবারের পরিমাণ কমতে কমতে এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে দিনে একবার খাওয়াও বন্ধ হয়ে যায়। আয়নায় নিজেকে নিয়ে অসন্তুষ্টি আর ওজন বাড়ার তীব্র ভয় তাঁকে ঠেলে দেয় অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা নামের এক জটিল মানসিক ব্যাধির দিকে।
ডায়েট থেকে মানসিক ব্যাধি
বর্তমানে ওজন নিয়ন্ত্রণ ও ফিটনেস সচেতনতা অনেকের জীবনযাপনের অংশ হয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্য সচেতনতা বা নিজেকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনের জন্য ডায়েট ও শরীরচর্চা স্বাভাবিক বিষয়। তবে এই সচেতনতা যখন অতিরিক্ত মাত্রায় পৌঁছে যায়, তখন তা ভয়াবহ মানসিক সমস্যার কারণ হতে পারে।
অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবসময় ওজন বেড়ে যাওয়ার আতঙ্কে থাকেন। ফলে তারা খাবার কমিয়ে দেন, কখনও পুরোপুরি খাওয়া বন্ধও করে দেন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—শরীর অত্যন্ত রোগা হয়ে গেলেও তারা নিজেদের ‘মোটা’ ভাবতেই থাকেন।
শরীর ও আচরণে যে পরিবর্তন দেখা যায়
এই রোগ শুধু শরীর নয়, আচরণেও বড় পরিবর্তন আনে।
শারীরিক লক্ষণ
- অস্বাভাবিক ওজন কমে যাওয়া
- দুর্বলতা ও মাথা ঘোরা
- অতিরিক্ত ঠান্ডা অনুভব করা
- চুল পড়া ও ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া
- মেয়েদের ঋতুচক্র অনিয়মিত বা বন্ধ হয়ে যাওয়া
আচরণগত পরিবর্তন
- ক্যালরি ও ওজন নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা
- বারবার ওজন মাপা বা আয়নায় নিজেকে দেখা
- খাবার এড়িয়ে যাওয়া বা খাওয়ার বিষয়ে মিথ্যা বলা
- খিটখিটে আচরণ ও সামাজিকতা কমে যাওয়া
- অতিরিক্ত ব্যায়াম বা ওজন কমানোর নানা চেষ্টা
কেন বাড়ছে এই সমস্যা
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। মানসিক, জৈবিক ও সামাজিক—বিভিন্ন উপাদান একসঙ্গে কাজ করে এ রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
ডিপ্রেশন, উদ্বেগ, ওসিডি বা অতিরিক্ত পারফেকশনিস্ট মানসিকতা অনেক ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সিনেমা ও বিজ্ঞাপনে ‘অতিরিক্ত পাতলা শরীর’কে সৌন্দর্যের মানদণ্ড হিসেবে তুলে ধরাও তরুণদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অনেক সময় ছোটবেলায় শরীর বা ওজন নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপও আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়, যা পরবর্তীতে খাদ্যাভ্যাসে গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
কতটা বিপজ্জনক এই রোগ
অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা শুধু মানসিক সমস্যা নয়; এটি শরীরের জন্যও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাবে হৃদ্যন্ত্র, হাড়, কিডনি ও হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। তাই এটিকে কখনোই সাধারণ ডায়েটিং হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
চিকিৎসা ও সুস্থ হয়ে ওঠার পথ
এই রোগ গুরুতর হলেও সঠিক চিকিৎসায় সুস্থ হওয়া সম্ভব। রোগীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়।
গুরুতর অপুষ্টির ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি করানো প্রয়োজন হতে পারে। ধীরে ধীরে পুষ্টিকর খাবারের মাধ্যমে ওজন স্বাভাবিক করার পাশাপাশি কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে রোগীর মানসিক ভয় দূর করার চেষ্টা করা হয়।
সাধারণত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদের সমন্বয়ে চিকিৎসা পরিচালিত হয়।
পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
অ্যানোরেক্সিয়ার বড় সমস্যা হলো, আক্রান্ত ব্যক্তিরা অনেক সময় নিজেরাই বুঝতে পারেন না যে তারা অসুস্থ। তাই পরিবার ও কাছের মানুষের সহানুভূতি এবং ধৈর্য্য এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জোর করে খাওয়ানোর বদলে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করা এবং ধীরে ধীরে মানসিক সমর্থন দেওয়াই বেশি কার্যকর।
সময়মতো চিকিৎসায় সম্ভব সুস্থতা
সুমাইয়ার মতো অনেকেই দীর্ঘ চিকিৎসা ও পরিবারের সহায়তায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরছেন। সচেতনতা, মানসিক সমর্থন এবং সঠিক চিকিৎসাই পারে এই নীরব অসুখ থেকে একজন মানুষকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে।
অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা বাইরে থেকে সহজে বোঝা না গেলেও এটি অত্যন্ত গুরুতর একটি মানসিক ব্যাধি। তাই সময়মতো লক্ষণ শনাক্ত করা এবং দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!