শিশুর স্ক্রিন টাইম: যা জানা জরুরি প্রতিটি অভিভাবকের
শিশুর মানসিক ও সামাজিক বিকাশ কোনো বিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া নয়—এটি গড়ে ওঠে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ভেতর দিয়েই। শৈশব থেকেই শিশু চারপাশের পরিবেশ, মানুষ ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শেখে। অপরিচিত পরিস্থিতি, ভিন্ন সংস্কৃতি কিংবা বড়দের আচরণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেই তারা পৃথিবীকে বুঝতে শুরু করে।
### শেখার মূল চাবিকাঠি: মানুষের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া
বড়রা যখন শিশুদের সঙ্গে সময় কাটান, তখন নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি, ভাষা ও আবেগ অজান্তেই তাদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়। চোখের দৃষ্টি, কণ্ঠস্বর, হাসি, হাতের নড়াচড়া—এসব সূক্ষ্ম আচরণই শিশুকে শেখায় কীভাবে যোগাযোগ করতে হয়, কীভাবে অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়।
কিন্তু এই সময়ে যদি বড়দের মনোযোগ স্ক্রিনে আটকে থাকে, তবে শিশুর শেখার সেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। শিশুদের কাছে যোগাযোগ কোনো তাত্ত্বিক ধারণা নয়—এটি তারা শেখে বাস্তব মুহূর্তে। স্কুলে যাওয়ার পথে শামুক দেখা, একসঙ্গে বই পড়া কিংবা পরিবারের সঙ্গে গল্প করা—এসব ছোট অভিজ্ঞতাই তাদের ‘মানুষ’ হয়ে ওঠার ভিত্তি গড়ে দেয়।
### ‘পোস্ট ডিজিটাল’ শৈশবের বাস্তবতা
বর্তমানে স্মার্টফোন, ট্যাব ও স্ট্রিমিং অ্যাপ পারিবারিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। গবেষণায় দেখা গেছে, দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের বড় একটি অংশ প্রতিদিন এক ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিনে কাটাচ্ছে। খুব অল্প বয়সেই স্ক্রিনে অভ্যস্ত হওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে।
গত দুই দশকের গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার শিশুদের খেলা, মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলছে। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে থাকলে শিশুদের কাজ শেষ করতে সমস্যা হয়, আবেগ নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয় এবং ঘুমের মান কমে যায়। এমনকি ঘরে ব্যাকগ্রাউন্ডে টিভি চালু থাকলেও শিশুদের খেলায় মনোযোগ কমে যেতে পারে।
### প্রযুক্তি কি পুরোপুরি ক্ষতিকর?
প্রযুক্তি মানেই যে ক্ষতি—তা নয়। মানসম্মত শিক্ষামূলক ভিডিও, ভালো কনটেন্ট বা উপযোগী অ্যাপ শিশুদের ভাষা শেখা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। প্রযুক্তি শিশুদের কিছু দক্ষতা বাড়ালেও অতিরিক্ত ব্যবহারে মনোযোগ, ঘুম ও সামাজিক মিথস্ক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এই কারণেই গবেষকেরা এখন খতিয়ে দেখছেন—ডিজিটাল অভ্যাস শিশুদের পরিবার ও স্কুলজীবনের সম্পর্ককে কীভাবে বদলে দিচ্ছে।
### কোনো জাদুকরি সমাধান নেই
ইতালীয় শিক্ষাবিদ মারিয়া মন্তেসরি একশ বছর আগেই বলেছিলেন—শিশুকে দেওয়া সবচেয়ে মূল্যবান উপহার হলো বড়দের মনোযোগ। শিশুর সঙ্গে থাকার সময় যদি বড়রা মনোযোগী হন, তাহলেই শিশু শেখে সে কী করতে পারে, অন্যদের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হতে হয়।
পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে খাবার খাওয়ার মতো সাধারণ অভ্যাসও শিশুর ভবিষ্যৎ বিকাশে গভীর প্রভাব ফেলে।
### অভিভাবকের জন্য কিছু বাস্তব পরামর্শ
* পরিবারের সবাই একসঙ্গে থাকেন—এমন সময়গুলোতে শিশুকে স্ক্রিনমুক্ত রাখুন
* ঘুমের আগে বই পড়া, গল্প বানানো বা দিনের ঘটনা নিয়ে কথা বলার অভ্যাস গড়ে তুলুন
* স্ক্রিন-ফ্রি সময় যতটা সম্ভব ধরে রাখুন
* খুব ক্লান্ত অবস্থায় প্রয়োজনে সীমিত সময় স্ক্রিন ব্যবহার করা যেতে পারে
* সব পরিবারের জন্য এক নিয়ম কার্যকর নাও হতে পারে—নিজেদের বাস্তবতা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিন
### শেষ কথা
ভবিষ্যতে শেখার ধরণ বদলাতে পারে, কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগের বিকল্প নেই। প্রযুক্তির ভালো ও মন্দ—দুই দিকই আছে। তাই শিশু কীভাবে, কতক্ষণ এবং কোন পরিস্থিতিতে স্ক্রিন ব্যবহার করছে—সেদিকে সচেতন নজর রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!