Dark Mode
Image
  • Sunday, 05 July 2026
সানস্ক্রিনে কি সত্যিই ত্বকের ক্যান্সার হয়? জানুন বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা

সানস্ক্রিনে কি সত্যিই ত্বকের ক্যান্সার হয়? জানুন বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা

তীব্র রোদে বাইরে বের হওয়ার আগে সানস্ক্রিন ব্যবহার এখন অনেকেরই দৈনন্দিন অভ্যাস। ক্ষতিকর অতিবেগুনি (UV) রশ্মি থেকে ত্বককে সুরক্ষিত রাখতে বিশ্বের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই সানস্ক্রিন ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে আসছেন।

তবে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে ভিন্ন এক দাবি। টিকটক, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে বিভিন্ন পোস্ট ও ভিডিওতে বলা হচ্ছে, সানস্ক্রিন ত্বককে রক্ষা করার বদলে উল্টো ত্বকের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। কিন্তু এই দাবির পক্ষে কী কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে?

সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো দাবির উৎস

The New York Times-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সানস্ক্রিনবিরোধী প্রচারণার পেছনে বিকল্প চিকিৎসাপদ্ধতির (Alternative Medicine) কিছু প্রচারক এবং বিতর্কিত বক্তার ভূমিকা রয়েছে।

এ ধরনের দাবির অন্যতম উৎস হিসেবে প্রায়ই উঠে আসে জার্মান বংশোদ্ভূত লেখক ডা. লিওনার্ড কোল্ডওয়েল। তিনি দাবি করেন, সূর্যের আলো ত্বকের ক্যান্সারের কারণ নয়; বরং সানস্ক্রিনে থাকা রাসায়নিক উপাদানই ক্যান্সারের জন্য দায়ী। এছাড়া অতীতে মানুষ সানস্ক্রিন ব্যবহার করত না, তাই তখন ত্বকের ক্যান্সারও কম ছিল—এমন দাবিও তিনি করে থাকেন।

চিকিৎসাবিজ্ঞান কী বলছে?

বিশ্বের ক্যান্সার গবেষক, চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থাগুলো এই দাবিকে ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর বলে উল্লেখ করেছে।

জার্মানির চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. উটা শ্লোসবার্গার জানান, বাজারে অনুমোদিত সানস্ক্রিনে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান থাকার কোনো প্রমাণ নেই। প্রসাধনী হিসেবে বাজারজাত হওয়ার আগে এসব পণ্য কঠোর নিরাপত্তা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যায়।

একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের এমডি অ্যান্ডারসন ক্যান্সার সেন্টারও জানিয়েছে, সানস্ক্রিন ব্যবহারে ত্বকের ক্যান্সার হয়—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

তাহলে বিভ্রান্তি তৈরি হলো কেন?

কিছু পুরোনো গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, যারা বেশি সানস্ক্রিন ব্যবহার করেন, তাদের মধ্যে মেলানোমা (এক ধরনের ত্বকের ক্যান্সার) তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।

তবে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এর কারণ সানস্ক্রিন নয়। বরং যারা দীর্ঘ সময় রোদে থাকেন, সমুদ্রসৈকতে যান বা সূর্যস্নান করেন, তারাই বেশি সানস্ক্রিন ব্যবহার করেন। অর্থাৎ ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে অতিরিক্ত অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শে থাকার কারণে, সানস্ক্রিন ব্যবহারের কারণে নয়।

অস্ট্রেলিয়ার ক্যান্সার কাউন্সিলের অধ্যাপক অ্যানি কাস্ট বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে একটি উদাহরণ দেন। তার ভাষায়, "বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরা মানুষের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা বেশি দেখা যায় বলে জ্যাকেটকে দায়ী করা যায় না। কারণ তারা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে থাকে। সানস্ক্রিনের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই রকম।"

রোদ কি ত্বকের ক্যান্সার থেকে রক্ষা করে?

না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী, সূর্যের অতিবেগুনি (UV-B) রশ্মি ত্বকের কোষের ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এই ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদে ত্বকের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

তবে সূর্যের আলো শরীরে ভিটামিন ডি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন সকালে ১০ থেকে ১৫ মিনিট হালকা রোদে থাকলেই প্রয়োজনীয় ভিটামিন ডি পাওয়া সম্ভব। অতিরিক্ত সময় কড়া রোদে থাকার প্রয়োজন নেই।

সানস্ক্রিন ব্যবহারে আন্তর্জাতিক নির্দেশনা

যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (FDA) সানস্ক্রিনকে ওভার-দ্য-কাউন্টার ওষুধ হিসেবে নিয়ন্ত্রণ করে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করে।

বিশেষজ্ঞরা SPF ৩০ বা তার বেশি এবং ব্রড-স্পেকট্রাম (UVA ও UVB উভয় রশ্মি থেকে সুরক্ষা দেয়) সানস্ক্রিন ব্যবহারের পরামর্শ দেন।

যারা কেমিক্যাল সানস্ক্রিন নিয়ে উদ্বিগ্ন, তারা চিকিৎসকের পরামর্শে জিংক অক্সাইড বা টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইড সমৃদ্ধ মিনারেল বা ফিজিক্যাল সানস্ক্রিন ব্যবহার করতে পারেন। এগুলো ত্বকের ওপর সুরক্ষার স্তর তৈরি করে এবং সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি প্রতিফলিত করে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, ত্বককে সুস্থ রাখতে শুধু সানস্ক্রিন ব্যবহারই যথেষ্ট নয়। দুপুরের তীব্র রোদ এড়িয়ে চলা, ছাতা বা টুপি ব্যবহার করা এবং দীর্ঘ সময় সরাসরি রোদে না থাকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান বৈজ্ঞানিক তথ্য বলছে, সানস্ক্রিন ত্বকের ক্যান্সারের কারণ নয়; বরং সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি অতিবেগুনি রশ্মির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে ত্বককে সুরক্ষা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

Comment / Reply From