Dark Mode
Image
  • Monday, 15 June 2026
সোশ্যাল মিডিয়ার নেশায় হারিয়ে যাচ্ছে তরুণরা, বাড়ছে মানসিক সংকট

সোশ্যাল মিডিয়ার নেশায় হারিয়ে যাচ্ছে তরুণরা, বাড়ছে মানসিক সংকট

বর্তমান ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। যোগাযোগ, বিনোদন ও তথ্য পাওয়ার সহজ মাধ্যম হিসেবে এর জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়লেও অতিরিক্ত ব্যবহার তরুণ প্রজন্মের জন্য নতুন এক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক মাধ্যমের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের মানসিক এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অনেক তরুণ সামাজিক মাধ্যম স্বাস্থ্যকর উপায়ে ব্যবহার করলেও একটি বড় অংশ ধীরে ধীরে আসক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এর ফলে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা, আত্মবিশ্বাসের অভাব, এমনকি আত্মবিধ্বংসী আচরণের মতো ঝুঁকিও বাড়ছে।

কৃত্রিম বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা

মানুষ স্বভাবগতভাবেই সামাজিক প্রাণী। বাস্তব জীবনের সম্পর্ক ও মুখোমুখি যোগাযোগ মানসিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে প্রদর্শিত জীবনযাপন, সৌন্দর্য বা সাফল্যের অনেক কিছুই সম্পাদিত ও সাজানো বাস্তবতা। অনেক তরুণ এসব ছবিকে বাস্তব মনে করে নিজেদের জীবন ও চেহারার সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করে। ফলে জন্ম নেয় হীনমন্যতা, হতাশা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট।

ঘুমের ঘাটতি বাড়াচ্ছে ঝুঁকি

সামাজিক মাধ্যমের নোটিফিকেশন ও অবিরাম স্ক্রলিংয়ের কারণে অনেক কিশোর-কিশোরী রাত জেগে ফোন ব্যবহার করে। ঘুমানোর সময়ও তারা ফোন হাতের কাছেই রাখে এবং বারবার নোটিফিকেশন চেক করে। এর ফলে পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন ঘুম ব্যাহত হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ঘুমের ঘাটতি থাকলে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, মনোযোগের সমস্যা, অতিরিক্ত অস্থিরতা এবং মানসিক চাপের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

বাস্তব জীবনের দায়িত্বে অবহেলা

অতিরিক্ত সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের ফলে অনেকেই বাস্তব জীবনের দায়িত্ব ও সম্পর্কের চেয়ে ভার্চুয়াল জগতকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে। বারবার ফোন চেক করার অভ্যাস পড়াশোনা, কাজ এবং পারিবারিক যোগাযোগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে দৈনন্দিন জীবনের উৎপাদনশীলতা কমে যায়।

শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব

সামাজিক মাধ্যমের আসক্তি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ কমিয়ে দিতে পারে। দীর্ঘ সময় অনলাইনে কাটানোর কারণে অনেকেই পড়াশোনার জন্য প্রয়োজনীয় সময় দিতে পারে না। পাশাপাশি ঘুমের ঘাটতির কারণে স্মৃতিশক্তি ও শেখার সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সম্পর্কের দূরত্ব বাড়ায়

সামাজিক মাধ্যম অনেক সময় বাস্তব সম্পর্কের জায়গা দখল করে নেয়। বন্ধু, পরিবার বা কাছের মানুষের সঙ্গে সময় কাটানোর পরিবর্তে অনলাইন যোগাযোগকে গুরুত্ব দেওয়া শুরু হয়। ফলে ধীরে ধীরে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হতে পারে এবং বাস্তব জীবনের সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে।

শরীর ও সৌন্দর্য নিয়ে অস্বস্তি

সামাজিক মাধ্যমে অন্যদের সাজানো জীবন ও চেহারা দেখে অনেক তরুণ নিজের শরীর বা ব্যক্তিত্ব নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে পড়ে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে শরীর নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এর ফলে কঠোর ডায়েটিং, খাদ্যাভ্যাসের অনিয়ম এবং আত্মসম্মানবোধের সংকট দেখা দিতে পারে।

বাড়ছে আত্মবিধ্বংসী আচরণের ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার, ঘুমের অভাব এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ফলে আত্মবিধ্বংসী আচরণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। অনলাইনে এমন কিছু কনটেন্ট বা গোষ্ঠীও রয়েছে, যা আত্মক্ষতিকর আচরণকে উৎসাহিত করে। সংবেদনশীল তরুণরা এসবের প্রভাবে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বিষণ্নতা ও উদ্বেগের বড় কারণ

নিজেকে অন্যদের সঙ্গে তুলনা করা, সবকিছু মিস হয়ে যাওয়ার ভয় (FOMO), লাইক ও প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীলতা—এসব কারণে তরুণদের মধ্যে উদ্বেগ ও বিষণ্নতা বাড়ছে। বাস্তব জীবনে আত্মবিশ্বাসের অভাব থাকলে অনেকেই ভার্চুয়াল জগতে আশ্রয় নেয়, যা একাকীত্ব আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

অভিভাবকদের করণীয়

সন্তানদের সামাজিক মাধ্যমের আসক্তি থেকে দূরে রাখতে অভিভাবকদের সচেতন ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশু ও কিশোরদের স্ক্রিন টাইম নির্ধারণ, সামাজিক মাধ্যমের নিরাপদ ব্যবহার শেখানো, নোটিফিকেশন নিয়ন্ত্রণ এবং বাস্তব জীবনের কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি এর সঠিক ও সীমিত ব্যবহার নিশ্চিত করাই হতে পারে তরুণ প্রজন্মকে সামাজিক মাধ্যমের অদৃশ্য ফাঁদ থেকে রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

Comment / Reply From

You May Also Like