Dark Mode
Image
  • Friday, 17 July 2026
হাজার বছরের চিয়া সিড, নতুন গবেষণায় মিলল চমকপ্রদ স্বাস্থ্য উপকারিতা

হাজার বছরের চিয়া সিড, নতুন গবেষণায় মিলল চমকপ্রদ স্বাস্থ্য উপকারিতা

বর্তমান সময়ে স্মুদি, পুডিং কিংবা লেবুর শরবতে চিয়া সিডের ব্যবহার দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তবে এই ছোট্ট বীজের ইতিহাস আজকের নয়; এর শিকড় কয়েক হাজার বছর আগের মধ্য আমেরিকার আজটেক ও মায়া সভ্যতায়। তখন চিয়া ছিল শুধু একটি খাদ্য নয়, বরং মূল্যবান কৃষিপণ্য, যা কর বা খাজনা হিসেবে দেওয়া হতো এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।

ইতিহাসবিদদের মতে, ভুট্টা, শিম ও স্কোয়াশের পাশাপাশি চিয়াও ছিল সেই সময়ের অন্যতম প্রধান খাদ্যসম্পদ। হাজার বছরের পুরোনো এই বীজ এখন আবার বিশ্বজুড়ে ‘সুপারফুড’ হিসেবে আলোচনায় এসেছে।

সম্প্রতি ‘কোজেন্ট ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনাধর্মী গবেষণায় চিয়া সিডের পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্যগত উপকারিতা নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তানজানিয়ার দুই গবেষক জোয়াকিম মাতোন্দো ও সিরি আবিহুদি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে এই পর্যালোচনা প্রকাশ করেন।

ছোট বীজে পুষ্টির ভাণ্ডার

আকারে ছোট হলেও চিয়া সিডে রয়েছে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় নানা গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। এর মধ্যে রয়েছে—

  • ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড (ALA)
  • উচ্চমানের উদ্ভিজ্জ প্রোটিন
  • মিউসিলেজ নামের দ্রবণীয় খাদ্যআঁশ
  • বি-জাতীয় ভিটামিনসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় খনিজ

গবেষণায় দেখা গেছে, চিয়ার প্রোটিন হজম হওয়ার সময় এমন কিছু বায়োঅ্যাকটিভ উপাদান তৈরি হয়, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে।

হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক

গবেষণায় চিয়া সিডের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উপকারিতার মধ্যে রয়েছে হৃদ্‌স্বাস্থ্য রক্ষা এবং রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ।

চিয়ায় থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের প্রদাহ কমাতে এবং রক্তের চর্বির ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে, যা হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।

এছাড়া চিয়ার দ্রবণীয় আঁশ পানির সংস্পর্শে জেল তৈরি করে। ফলে খাবার ধীরে হজম হয় এবং গ্লুকোজ ধীরে শোষিত হওয়ায় খাবারের পর রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা কমে।

ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে সহায়ক ভূমিকা

চিয়া সিড দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতেও সাহায্য করতে পারে।

গবেষকদের মতে, এর আঁশ পানি শোষণ করে ফুলে ওঠায় দ্রুত তৃপ্তির অনুভূতি তৈরি হয়। একই সঙ্গে এটি ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী কিছু হরমোনের কার্যক্রমেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণ সহজ হতে পারে।

অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী

চিয়ার আঁশ প্রিবায়োটিক হিসেবে কাজ করে, যা অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি বাড়াতে সহায়তা করে। এর ফলে শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড উৎপাদন বাড়ে, যা হজম প্রক্রিয়া উন্নত করার পাশাপাশি অন্ত্রের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

রান্নাঘরের বাইরেও জনপ্রিয়

চিয়ার বিশেষ জেল তৈরির বৈশিষ্ট্য খাদ্যশিল্পেও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

গ্লুটেন-মুক্ত বেকারি পণ্য, কুকিজ, মাংসজাত খাবারে চর্বির বিকল্প হিসেবে এবং ভিগান রান্নায় ডিমের পরিবর্তে চিয়া সিড ব্যবহার করা হচ্ছে।

কিছু সতর্কতাও রয়েছে

যদিও চিয়া সিড পুষ্টিকর, তবুও এটি সবার জন্য সমানভাবে উপযোগী নাও হতে পারে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, কিছু মানুষের ক্ষেত্রে চিয়ায় অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এছাড়া এতে থাকা ফাইটিক অ্যাসিড ক্যালসিয়াম, আয়রন ও জিংকের মতো কিছু খনিজের শোষণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

অন্যদিকে চিয়ায় থাকা অসম্পৃক্ত চর্বি সহজেই জারিত হতে পারে। তাই এটি সবসময় বায়ুরোধী পাত্রে, ঠান্ডা ও শুষ্ক স্থানে সংরক্ষণ করা উচিত।

আরও গবেষণার প্রয়োজন

গবেষকদের মতে, চিয়া সিডের স্বাভাবিক অণুজীব (ন্যাটিভ মাইক্রোবায়োম) এবং আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতি নিয়ে এখনো পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি। ভবিষ্যতে এসব বিষয়ে আরও গবেষণা হলে চিয়ার স্বাস্থ্যগত উপকারিতা আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চিয়া সিড নিঃসন্দেহে একটি পুষ্টিকর খাবার। তবে এটি কোনো অলৌকিক সমাধান নয়। সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অংশ হিসেবে চিয়া সিড গ্রহণ করলে সবচেয়ে ভালো উপকার পাওয়া যায়। নতুন কোনো খাবার নিয়মিত খাদ্যতালিকায় যোগ করার আগে প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

Comment / Reply From