হান্টাভাইরাস: নতুন আতঙ্ক নাকি সীমিত ঝুঁকি?
সম্প্রতি আটলান্টিক মহাসাগরে ভ্রমণরত একটি ক্রুজ জাহাজে হান্টাভাইরাস সংক্রমণের ঘটনায় বিশ্বজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কয়েকজন যাত্রীর মৃত্যু এবং বিভিন্ন দেশে সম্ভাব্য সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত করার পর বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ মানুষের জন্য আতঙ্কিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।
কী ঘটেছে ক্রুজ জাহাজে?
আর্জেন্টিনা থেকে যাত্রা শুরু করা ‘এমভি হন্ডিয়াস’ নামের একটি বিলাসবহুল ক্রুজ জাহাজে হান্টাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ে। জাহাজটিতে বিভিন্ন দেশের প্রায় ১৫০ জন যাত্রী ও ক্রু ছিলেন। এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে ডব্লিউএইচও। আরও কয়েকজনকে চিকিৎসার জন্য সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
জাহাজে শনাক্ত হওয়া ভাইরাসটি ছিল অ্যান্ডিস স্ট্রেইনের হান্টাভাইরাস, যা বিরল ক্ষেত্রে মানুষ থেকে মানুষেও ছড়াতে পারে। ফলে সংস্পর্শে আসা যাত্রীদের খুঁজে বের করতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নজরদারি শুরু হয়েছে।
হান্টাভাইরাস কী?
হান্টাভাইরাস মূলত ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর শরীরে থাকা এক ধরনের ভাইরাস। সাধারণত ইঁদুরের প্রস্রাব, লালা বা শুকনো মলের ক্ষুদ্র কণা বাতাসে মিশে মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে সংক্রমণ ঘটে। খুব কম ক্ষেত্রে কামড় বা আঁচড় থেকেও এটি ছড়াতে পারে।
এই ভাইরাস থেকে দুটি গুরুতর রোগ হতে পারে—
- হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম (HPS) : এতে জ্বর, ক্লান্তি, পেশিতে ব্যথা ও পরে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়।
- হেমোরেজিক ফিভার উইথ রেনাল সিনড্রোম (HFRS) : এটি কিডনির ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলে এবং অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ ঘটাতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত জটিলতা তৈরি হলে মৃত্যুঝুঁকিও অনেক বেড়ে যায়।
কেন এটি নিয়ে আলোচনা বাড়ছে?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, সাম্প্রতিক ঘটনাটিতে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের সম্ভাবনা দেখা গেছে, যা হান্টাভাইরাসের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বিরল। তবে ডব্লিউএইচও জোর দিয়ে বলছে, এটি কোভিড-১৯ ধরনের মহামারির সূচনা নয়।
সংস্থাটির বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাইরাসটি খুব সহজে বাতাসে ছড়ায় না। মূলত ঘনিষ্ঠ ও দীর্ঘ সময়ের সংস্পর্শে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে।
লক্ষণগুলো কী?
হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত হলে শুরুতে সাধারণ ফ্লুর মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যেমন—
- জ্বর ও শরীর ব্যথা
- অতিরিক্ত ক্লান্তি
- মাথা ঘোরা
- বমিভাব বা পেটের সমস্যা
- শ্বাসকষ্ট
গুরুতর ক্ষেত্রে ফুসফুস ও কিডনি আক্রান্ত হতে পারে।
চিকিৎসা আছে কি?
এ ভাইরাসের নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক বা ওষুধ এখনো নেই। রোগীর উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়। গুরুতর রোগীদের আইসিইউ, অক্সিজেন থেরাপি কিংবা ভেন্টিলেশন প্রয়োজন হতে পারে।
ঝুঁকি কমাতে কী করবেন?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। হান্টাভাইরাস থেকে সুরক্ষার জন্য—
- ঘর বা গুদামে ইঁদুরের উপদ্রব কমাতে হবে
- ইঁদুরের মল বা নোংরা পরিষ্কার করার সময় মাস্ক ব্যবহার করতে হবে
- বদ্ধ ও ধুলাবালিযুক্ত জায়গা পরিষ্কারের আগে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে
- খাবার ও বাসস্থান পরিষ্কার রাখতে হবে
ডব্লিউএইচও কী বলছে?
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের জন্য সামগ্রিক ঝুঁকি কম। তবে ভাইরাসটির ইনকিউবেশন পিরিয়ড দীর্ঘ হওয়ায় আগামী কয়েক সপ্তাহ নজরদারি অব্যাহত থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি নিয়ে অযথা আতঙ্ক নয়, বরং তথ্যভিত্তিক সচেতনতাই সবচেয়ে জরুরি।
Description:
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!