Dark Mode
Image
  • Thursday, 29 January 2026

উৎসবের পোশাকের নেপথ্যের নীরব কারিগররা: আয়েশা আবেদ ফাউন্ডেশনের গল্প

উৎসবের পোশাকের নেপথ্যের নীরব কারিগররা: আয়েশা আবেদ ফাউন্ডেশনের গল্প

উৎসবের পোশাকের নেপথ্যের নীরব কারিগররা: আয়েশা আবেদ ফাউন্ডেশনের গল্প

উৎসবে যে পোশাকটি আপনাকে আনন্দ দেয়, আত্মবিশ্বাস বাড়ায়—তার পেছনে জড়িয়ে আছে হাজারো নারীর নিরলস পরিশ্রম আর এক অনন্য সামাজিক উদ্যোগের গল্প। সেই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আয়েশা আবেদ ফাউন্ডেশন, যার প্রধান কারখানা মানিকগঞ্জে অবস্থিত।

শুরুর গল্প: নারীর ক্ষমতায়নের স্বপ্ন

১৯৭০-এর দশকের শুরুতে বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীরা ছিলেন মূলত গৃহস্থালি কাজেই সীমাবদ্ধ। অর্থ উপার্জনের সুযোগ বা নিজস্ব মত প্রকাশের স্বাধীনতা তখন ছিল কল্পনাতীত। এই বাস্তবতায় নারীদের স্বাবলম্বী করার স্বপ্ন দেখেন ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ফজলে হাসান আবেদের সহধর্মিণী আয়েশা আবেদ।

এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৯৭৬ সালে মানিকগঞ্জে একটি ভাড়া বাসায় মাত্র পাঁচজন দুস্থ নারীকে নিয়ে শুরু হয় কাঁথা সেলাইয়ের কাজ। কাঁথা বিক্রির অর্থই ছিল তাঁদের পারিশ্রমিক। শুরুতে বিক্রির জন্য একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হলেও লাভের বড় অংশ চলে যাওয়ায় আয়েশা আবেদ সিদ্ধান্ত নেন—নিজস্ব বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

আড়ংয়ের জন্ম

এই ভাবনা থেকেই ১৯৭৮ সালে ঢাকার শ্যামলীতে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘আড়ং’। গ্রাম্যমেলার ভাবনা থেকে নেওয়া এই নামের সঙ্গে ধীরে ধীরে যুক্ত হতে থাকে আরও নারী, আরও পণ্য, আরও স্বপ্ন। তবে ১৯৮১ সালে এক দুর্ঘটনায় আয়েশা আবেদের অকাল মৃত্যু এই পথচলাকে থামিয়ে দিতে পারেনি।

ফাউন্ডেশনের বিস্তার

আয়েশা আবেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে ১৯৮৩ সালে মানিকগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত হয় আয়েশা আবেদ ফাউন্ডেশন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ফাউন্ডেশন ছড়িয়ে পড়ে জামালপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, শেরপুর, ঝিনাইদহ, রাজবাড়ী, নীলফামারী ও কুড়িগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। বর্তমানে দেশে ১৪টি ফাউন্ডেশন চালু রয়েছে এবং মাগুরায় আরও একটি নির্মাণাধীন।

হাজারো নারীর কর্মসংস্থান

আয়েশা আবেদ ফাউন্ডেশন মূলত আড়ংয়ের পণ্য উৎপাদনের কারখানা, আর আড়ং হলো ব্র্যাকের বিপণন কেন্দ্র। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন ফাউন্ডেশনে কাজ করছেন প্রায় ৩০ হাজার কর্মী, পাশাপাশি যুক্ত আছেন ৩৫ হাজার প্রডিউসার। সব মিলিয়ে প্রায় ৬৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে এই উদ্যোগ, যার ৯০ শতাংশই নারী।

মানিকগঞ্জের প্রধান কারখানার অধীনে রয়েছে ৫টি শাখা ও ৮০টি সাব-সেন্টার। এখানে তৈরি হয় শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, পাঞ্জাবি, শার্টসহ নানা পোশাক। এছাড়া নকশীকাঁথা তৈরি হয় দেশের বিভিন্ন জেলায় অবস্থিত সাব-সেন্টারগুলোতে।

মানবিক কর্মপরিবেশ

এখানে কেউ বাধ্যতামূলকভাবে কাজ করেন না। যে যতটুকু কাজ করেন, সে অনুযায়ী পারিশ্রমিক পান। কাজের ধরন অনুযায়ী মাসে আয় হয় প্রায় ৫ থেকে ২০ হাজার টাকা, উৎসবের সময় যা আরও বেড়ে যায়। কর্মীরা সবাই ব্র্যাক সমিতির সদস্য হওয়ায় সঞ্চয় ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সুযোগ পান। পাশাপাশি রয়েছে বিনামূল্যের চিকিৎসাসেবা।

নীরব নায়করা

ফাউন্ডেশনের ম্যানেজার (অ্যাডমিন, কমপ্লায়েন্স ও লজিস্টিকস) মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন বলেন,
“আমরা কর্মীদের কাজের মধ্যেই প্রশিক্ষণ দিই। নতুন কর্মীকে একজন দক্ষ কর্মীর তত্ত্বাবধানে রেখে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। একটি ডিজাইন থেকে সীমিত সংখ্যক পণ্য তৈরি করা হয়, যাতে গুণগত মান বজায় থাকে।”

দীর্ঘ ২২ বছর ধরে আড়ংয়ের সঙ্গে যুক্ত গিয়াস উদ্দিন বলেন,
“আমরা দোকান থেকে পণ্য কিনি, কিন্তু এর পেছনে যে হাজারো নারী দিনরাত পরিশ্রম করছেন—সে গল্প খুব কম মানুষই জানে।”

একটি পোশাক, একটি গল্প

আয়েশা আবেদ ফাউন্ডেশন শুধু একটি কারখানা নয়—এটি নারীর ক্ষমতায়ন, কারুশিল্প সংরক্ষণ এবং মানবিক অর্থনীতির এক অনন্য উদাহরণ। আপনার পরা প্রতিটি পোশাকের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সেই নীরব শ্রম, স্বপ্ন আর সংগ্রামের গল্প।

Comment / Reply From