মৌলভীবাজারে মধু চাষের নীরব বিপ্লব, বদলাচ্ছে ৬০০ পরিবারের জীবন 🍯
স্বল্প পুঁজি, সহজ পদ্ধতি এবং ভালো লাভের সম্ভাবনার কারণে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় মধু চাষে আগ্রহ বাড়ছে দিন দিন। বর্তমানে উপজেলার অন্তত ৩০টি গ্রামের প্রায় ৬০০ পরিবার এই চাষের সঙ্গে যুক্ত। ফলে জেলাটিতে বাণিজ্যিকভাবে মধু চাষ এক ধরনের নীরব বিপ্লব সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় এক দশক আগে কাঠালকান্দি গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল গফুর পাহাড়ি এলাকায় মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে একটি রানি মৌমাছি ধরে এনে কাঠের বাক্সে রেখে দেন। রানি মৌমাছিকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে সেখানে হাজারো মৌমাছি জমা হতে শুরু করে। এভাবেই তার হাত ধরে শুরু হয় বাক্স পদ্ধতিতে মধু চাষ।
একটি রানি মৌমাছি থেকে ধীরে ধীরে নতুন রানির জন্ম হয় এবং সেই সঙ্গে আশপাশের গ্রামগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে এই পদ্ধতির মধু চাষ।
মধু বহুদিন ধরেই প্রাকৃতিক ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তাই খাঁটি মধুর চাহিদাও অনেক। স্থানীয় চাষিদের কাছ থেকে সরাসরি খাঁটি মধু কিনতে পারায় ক্রেতাদেরও আলাদা করে বাজারে যেতে হয় না।
কীভাবে শুরু হয়েছিল মধু চাষ
কাঠালকান্দি গ্রামের চাষি আব্দুল গফুর জানান, একসময় ভারতের পাহাড়ি এলাকার এক বন্ধুর কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন মৌমাছি কীভাবে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় জমা হয়। মূলত যেখানে রানি মৌমাছি থাকে, সেখানেই অন্য মৌমাছিরা চাক তৈরি করে এবং ফুলের রেণু জমা করে মধু উৎপাদন করে।
এই ধারণা থেকে তিনি বনে গিয়ে একটি রানি মৌমাছি শনাক্ত করেন এবং ছিদ্রযুক্ত একটি বাঁশের চোঙের মধ্যে সেটিকে আটকে রাখেন। কিছু সময়ের মধ্যেই সেখানে কর্মী মৌমাছির ঝাঁক জমা হতে শুরু করে। এভাবেই তার মধু চাষের যাত্রা শুরু।
প্রথমদিকে তিনি সনাতনী পদ্ধতিতে চাষ করলেও পরে প্রশিক্ষণ নিয়ে আধুনিক বাক্স পদ্ধতিতে মধু চাষ শুরু করেন।
বাড়ির আঙিনাতেই মধু উৎপাদন
আব্দুল গফুরের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বসতঘরের চারপাশে মাটি থেকে কিছুটা উঁচু করে কাঠের বেশ কয়েকটি বাক্স বসানো রয়েছে। বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা করতে বাক্সগুলোর উপরে টিনের ছাউনি দেওয়া হয়েছে।
প্রতিটি বাক্সের নিচে ছোট ছিদ্রযুক্ত নেট লাগানো থাকে, যার মাধ্যমে কর্মী মৌমাছি সহজে আসা-যাওয়া করতে পারে। তবে রানি মৌমাছি আকারে বড় হওয়ায় সেই ছিদ্র দিয়ে বের হতে পারে না।
এক সময় মধু সংগ্রহের জন্য পাহাড়ি বনে যেতে হলেও এখন বাড়িতে বসেই মধু সংগ্রহ করছেন তিনি। এতে ভালো আয়ও হচ্ছে। তবে ফুল কমে যাওয়া, খরা বা অতিবৃষ্টির কারণে কখনো কখনো উৎপাদনে প্রভাব পড়ে বলে জানান তিনি।
‘মধু মঙ্গল’ নামে পরিচিত আরেক সফল চাষি
কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের কোনাগাঁও গ্রামের কৃষক বদরুজ্জামান মঙ্গলও মধু চাষে বেশ সফল। প্রায় ১০ বছর আগে মাত্র ১৫০ টাকা খরচ করে একটি কাঠের বাক্স তৈরি করে তিনি মধু চাষ শুরু করেন।
বর্তমানে তার বাড়িতে ১৩টি এবং বাড়ির বাইরে আরও প্রায় ৫০টি মৌমাছির বাক্স রয়েছে। এসব থেকে বছরে প্রায় এক লাখ টাকার মধু বিক্রি করেন তিনি। এলাকায় সবাই তাকে ‘মধু মঙ্গল’ নামেই চেনেন।
তিনি জানান, সাধারণত বছরে দুইবার মধু সংগ্রহ করা যায়। একটি বাক্স থেকে বছরে প্রায় ৫ থেকে ১০ কেজি পর্যন্ত মধু পাওয়া সম্ভব। বর্তমানে প্রতি লিটার মধু ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কমলগঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে মধু চাষ
কমলগঞ্জ উপজেলার জালালিয়া, বালিগাঁও, ইটখোলা, রাজটিলা, মাধবপুর, ধলাইরপাড়, সলিমবাজার, কাঠালকান্দি, কালারবিল, কানাইদেশীসহ বিভিন্ন গ্রামে এখন মধু চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের মতে, প্রায় পাঁচ শতাধিক মানুষ এই পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি করেছেন।
কমলগঞ্জ উপজেলা মধু চাষি উন্নয়ন পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আজাদ মিয়া জানান, পুরো জেলায় এখন প্রায় ৪ হাজারের মতো মৌমাছির বাক্স স্থাপন করা হয়েছে। নতুন উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়ার কাজও করা হচ্ছে।
সংগঠনের সভাপতি আলতাফ মাহমুদ বাবুল বলেন, “মধু চাষে বাড়তি সময় দিতে হয় না। অনেক পরিবার এই চাষের মাধ্যমে বাড়তি আয় করছে এবং সংসারে স্বাচ্ছন্দ্য ফিরেছে।”
সরকারি সহযোগিতার আশ্বাস
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা Makhan Chandra Sutradhar জানান, মধু চাষিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তাদের বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা করা হবে। প্রয়োজনে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থাও করা হবে।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!