চেক ডিজঅনার হলে কী করবেন? জানুন আইনি করণীয় ও প্রতিকার
পাওনা টাকা পরিশোধের জন্য অনেক সময় দেনাদার চেক প্রদান করেন। কিন্তু ব্যাংকে গিয়ে দেখা যায়, নির্ধারিত হিসাবে পর্যাপ্ত অর্থ নেই। আবার কখনো ভবিষ্যতের একটি তারিখ উল্লেখ করে দেওয়া চেক নির্ধারিত দিনে জমা দিলেও একই সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এ অবস্থায় অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন—কী করবেন, কীভাবে আইনের মাধ্যমে টাকা আদায় সম্ভব?
আইন অনুযায়ী, এ ধরনের ঘটনা **চেক প্রতারণা বা চেক ডিজঅনার** হিসেবে গণ্য হয় এবং এটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
চেক ডিজঅনার কী?
চেক ডিজঅনার বলতে বোঝায়—যখন কোনো ব্যক্তি তার ব্যাংক হিসাবে পর্যাপ্ত টাকা না থাকা সত্ত্বেও ঋণ বা দায় পরিশোধের উদ্দেশ্যে চেক ইস্যু করেন এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সেই চেক অপরিশোধিত অবস্থায় ফেরত দেয়।
বাংলাদেশে এই অপরাধের বিচার হয় Negotiable Instruments Act, 1881–এর ১৩৮ থেকে ১৪১ ধারা অনুযায়ী।
ধারা ১৩৮ অনুযায়ী অপরাধের ব্যাখ্যা
যদি কোনো ব্যক্তি তার ব্যাংক হিসাব থেকে অন্য কাউকে অর্থ পরিশোধের জন্য চেক ইস্যু করেন এবং—
* হিসাবে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকে, অথবা
* ব্যাংকের সঙ্গে নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে চেক ইস্যু করা হয়,
এবং এর ফলে চেক ফেরত আসে—তাহলে সেটি আইনের চোখে অপরাধ।
শাস্তির বিধান
চেক ডিজঅনার অপরাধে সর্বোচ্চ—
এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, এবং
চেকে উল্লিখিত টাকার সর্বোচ্চ চার গুণ পর্যন্ত অর্থদণ্ড
দেওয়া হতে পারে।
চেক কী?
চেক হলো একটি লিখিত নিঃশর্ত আদেশ, যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি তার ব্যাংককে নির্দেশ দেন নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ কোনো ব্যক্তি, আদেশপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা চেক বাহককে পরিশোধ করতে। এতে ইস্যুকারীর স্বাক্ষর থাকা আবশ্যক।
কে চেক ইস্যু করতে পারে?
যিনি বৈধভাবে ব্যাংক হিসাব খুলে চেকবই গ্রহণ করেছেন, তিনিই নিজের বা অন্যের অনুকূলে চেক ইস্যু করতে পারেন।
চেকের মেয়াদ কতদিন?
চেকে উল্লেখিত তারিখ থেকে **৬ (ছয়) মাসের মধ্যে** চেক ব্যাংকে উপস্থাপন করতে হয়। নির্ধারিত সময় অতিক্রম করলে চেকটি বাতিল বলে গণ্য হয়।
মামলা করার পূর্বশর্ত: আইনি নোটিশ
চেক ডিজঅনার মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো আইনি নোটিশ (Legal Notice) প্রদান।
চেক প্রত্যাখ্যান হওয়ার পর—
* ৩০ দিনের মধ্যে চেকের ধারককে
* চেক ইস্যুকারীর কাছে
* রেজিস্টার্ড ডাকযোগে প্রাপ্তি স্বীকারপত্রসহ
আইনি নোটিশ পাঠাতে হবে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নোটিশ না দিলে মামলা করার সুযোগ নষ্ট হয়ে যাবে।
মামলা দায়েরের সময়সীমা
আইনি নোটিশ পাওয়ার পরও যদি চেকদাতা—
৩০ দিনের মধ্যে টাকা পরিশোধ না করেন,
তাহলে নোটিশের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে আদালতে মামলা দায়ের করতে হবে।
এই সময়সীমা অতিক্রম হলে ১৩৮ ধারায় আর মামলা করা যাবে না।
মামলার বৈশিষ্ট্য
* চেক ডিজঅনার মামলা জামিনযোগ্য ও আপোষযোগ্য
* রায়ের পর আসামি পক্ষ হাইকোর্টে আপিল করতে পারেন
বিকল্প আইনি ব্যবস্থা
যদি কোনো কারণে চেক ডিজঅনার মামলা তামাদি হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে ভুক্তভোগী ব্যক্তি দণ্ডবিধির ৪২০ (প্রতারণা) ও ৪০৬ (বিশ্বাসভঙ্গ) ধারায় মামলা করতে পারবেন।
---
লিখেছেন:
পারভেজ হোসেন
শিক্ষানবিশ আইনজীবী
ঢাকা জজ কোর্ট
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!