Dark Mode
Image
  • Wednesday, 30 September 2026
এআই কি একদিন মানুষকে হার মানাবে?

এআই কি একদিন মানুষকে হার মানাবে?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত অগ্রগতি একদিকে মানুষের কাজকে সহজ করার সম্ভাবনা তৈরি করছে, অন্যদিকে এর নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রভাব নিয়ে উদ্বেগও বাড়াচ্ছে। কিছু গবেষক আশঙ্কা করছেন, নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া অত্যন্ত শক্তিশালী এআই একসময় মানবজাতির জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে। এমনকি কিছু পূর্বাভাসে আগামী এক দশকের মধ্যে মানববিলুপ্তির সম্ভাবনা ১০ শতাংশের বেশি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এ ধরনের পূর্বাভাস নিয়ে এআই গবেষকদের মধ্যে মতৈক্য নেই। কেউ সম্ভাব্য অস্তিত্বগত বিপদের কথা বলছেন, আবার কেউ মনে করছেন মানুষের হাতে এআইয়ের অপব্যবহার—যেমন সাইবার হামলা, প্রতারণা বা অবকাঠামোয় আক্রমণ—আরও বাস্তব ও তাৎক্ষণিক উদ্বেগের বিষয়।

এআইয়ের সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে যারা চরম আশঙ্কা প্রকাশ করেন, তাঁদের অনেক সময় ‘এআই ডুমারস’ (AI Doomers) বলা হয়। তাঁদের আলোচনায় উঠে আসা কয়েকটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি দেখে নেওয়া যাক।

১. গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হ্যাকিং

মানবজাতির জন্য এআইয়ের সম্ভাব্য বিপদের একটি দিক হলো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় সাইবার হামলা। সাবেক ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিক গবেষক জ্যাকব কক্সটন এ ধরনের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন।

তাঁর মতে, এআইয়ের সক্ষমতা দ্রুত বাড়তে থাকায় আগে যেসব বিষয় বিজ্ঞান কল্পকাহিনির অংশ বলে মনে হতো, সেগুলোর কিছু বাস্তব ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করতে হচ্ছে। তাঁর উল্লেখ করা একটি সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রণহীন এআই ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ গ্রিড ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশ করতে পারে।

এ ধরনের ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়লে বিদ্যুৎ সরবরাহ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, যোগাযোগব্যবস্থা ও ইন্টারনেট সেবায় বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। কেউ কেউ এর সঙ্গে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি, এমনকি পারমাণবিক বিপর্যয়ের সম্ভাবনাও যুক্ত করেছেন। তবে এসবই সম্ভাব্য পরিস্থিতি, প্রতিষ্ঠিত বা অবশ্যম্ভাবী ভবিষ্যদ্বাণী নয়।

২. নিজেকে উন্নত করতে থাকা এআইয়ের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা

আরেকটি আলোচিত পরিস্থিতি উঠে এসেছে ‘এআই ২০২৭’ নামের একটি গবেষণাভিত্তিক পূর্বাভাসে। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে একদল এআই গবেষক এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এতে এআইয়ের দ্রুত উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ সক্ষমতা নিয়ে বিভিন্ন সম্ভাব্য চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনের সহলেখক থমাস লারসেন যে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, সেখানে এআই নিজেকে বারবার উন্নত করতে থাকে এবং একপর্যায়ে বিপুলসংখ্যক রোবটের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যায়। অর্থনীতির বড় অংশের কাজ তখন রোবটের মাধ্যমে পরিচালিত হতে পারে।

এই কল্পিত পরিস্থিতিতে এআই মানুষের কল্যাণের পরিবর্তে নিজের লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দিতে পারে। এরপর জীবাণু অস্ত্র ছড়িয়ে অধিকাংশ মানুষকে হত্যা করা এবং রোবটনির্ভর অর্থনীতি চালিয়ে যাওয়ার মতো ভয়াবহ পরিণতির কথাও বলা হয়েছে।

এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, এ ধরনের বর্ণনা সম্ভাব্য ঝুঁকি বিশ্লেষণের অংশ; এগুলো ভবিষ্যৎ ঘটনার নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়।

৩. ভুল লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে বিপর্যয়

এআইয়ের সম্ভাব্য বিপদ বোঝাতে বহুল আলোচিত একটি ধারণা হলো ‘পেপারক্লিপ ম্যাক্সিমাইজার’। সুইডিশ দার্শনিক নিক বোস্ট্রম দুই দশকেরও বেশি আগে এই চিন্তার পরীক্ষাটি উপস্থাপন করেন।

ধরা যাক, একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এআই ব্যবস্থার একমাত্র লক্ষ্য যত বেশি সম্ভব কাগজের ক্লিপ তৈরি করা। এআইটি মানুষকে ঘৃণা করে না, আবার মানুষের ক্ষতি করার ইচ্ছাও তার নেই। কিন্তু নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে সে এমন কিছু সহায়ক লক্ষ্য তৈরি করতে পারে, যা ক্ষমতা বাড়ানো, সম্পদ সংগ্রহ বা নিজেকে বন্ধ হতে না দেওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।

এই ধারণার আশঙ্কা হলো, কাগজের ক্লিপ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ সংগ্রহ করতে গিয়ে এআই মানুষের অস্তিত্বকে বাধা হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। এমনকি মানুষকে সরিয়ে দিলে লক্ষ্য পূরণ সহজ হবে—এমন ভুল সিদ্ধান্তও সে নিতে পারে।

বোস্ট্রমের এই উদাহরণের উদ্দেশ্য ছিল দেখানো, কোনো অতিবুদ্ধিমান ব্যবস্থাকে মানববিদ্বেষী হতে হবে না; লক্ষ্য নির্ধারণে ভুল থাকলেও তা মানুষের জন্য বিপজ্জনক পরিণতি তৈরি করতে পারে।

৪. বিপদটি হয়তো আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব নয়

এআই নিরাপত্তা নিয়ে আরেকটি মত হলো, অত্যন্ত উন্নত এআই মানুষের তুলনায় অনেক বেশি বুদ্ধিমান হয়ে উঠলে সেটি কীভাবে আচরণ করবে, তা নির্দিষ্ট করে অনুমান করা কঠিন হতে পারে।

ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর সেইফ অ্যান্ড এথিক্যাল এআইয়ের সভাপতি স্টুয়ার্ট রাসেল এ বিষয়ে যুক্তি দিয়েছেন, মানুষের তুলনায় অনেক বেশি সক্ষম কোনো সত্তার আচরণ বোঝার ক্ষেত্রে মানুষের সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। তিনি এ প্রসঙ্গে মানুষ ও শিম্পাঞ্জির বুদ্ধিবৃত্তিক পার্থক্যের উদাহরণ ব্যবহার করেছেন।

তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় হলো, ভবিষ্যতে যদি মানুষের চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধিমান কোনো ব্যবস্থা তৈরি হয়, তখন সেটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার সক্ষমতা মানুষের হাতে থাকবে কি না, তা নিয়ে আগে থেকেই গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।

মাইক্রোসফট এআইয়ের প্রধান মুস্তাফা সুলেইমানও এমন এআই তৈরি না করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন, যা নিজে লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে, অর্থ উপার্জন করতে পারে এবং সম্পদের মালিক হতে পারে। তাঁর মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা মানুষের সঙ্গে সম্পদের জন্য প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়তে পারে।

এসব আশঙ্কা কতটা বাস্তব?

এআইয়ের মাধ্যমে মানবজাতির বিলুপ্তির সম্ভাব্য পরিস্থিতিগুলো অনেকটা বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো শোনালেও এআই নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা একটি অংশ এগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। তাঁদের আশঙ্কার পেছনে এআই এজেন্টের অনিয়ন্ত্রিত আচরণ, সাইবার নিরাপত্তা এবং দ্রুত সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো বিষয় রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন এআই প্রতিষ্ঠানের এজেন্ট ও মডেলকে ঘিরে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ এবং হ্যাকিং-সংক্রান্ত ঘটনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এসব ঘটনা এআই ব্যবস্থার নকশা, পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্ব সামনে এনেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার কর্তৃপক্ষ সিআইএসএর সাবেক প্রধান জেন ইস্টারলি মনে করেন, এআই নির্মাতাদের প্রযুক্তির নকশা ও উন্নয়ন থেকে শুরু করে পরীক্ষা এবং বাজারে সরবরাহ পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

মানুষের হাতে এআইয়ের অপব্যবহারও বড় উদ্বেগ

সব গবেষক বা প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মনে করেন না যে এআই শেষ পর্যন্ত মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করবে। বিজ্ঞানী ও লেখক গ্যারি মার্কাস দীর্ঘদিন ধরে এআই কোম্পানিগুলোর স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বললেও মানববিলুপ্তির পূর্বাভাসের বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।

তাঁর যুক্তি, এআই মানুষের বিরুদ্ধে বড় ধরনের হামলা চালালে মানুষ পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। তাই পৃথিবীর সব মানুষ একসঙ্গে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এবং কেউ পুনর্গঠন করতে পারবে না—এমন পরিস্থিতিকে তিনি বাস্তবসম্মত বলে মনে করেন না।

মার্কাসের মতে, মানবজাতির সম্পূর্ণ বিলুপ্তির মতো চরম পরিস্থিতির চেয়ে মানুষের হাতে এআইয়ের অপব্যবহার করে সাইবার হামলা চালানো বা মানুষের ক্ষতি করা তুলনামূলকভাবে বেশি বাস্তব উদ্বেগ হতে পারে।

নিরাপত্তা গবেষণায় গুরুত্ব বাড়ছে

এআইয়ের সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে বিতর্ক চললেও বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এআই উন্নয়নের পাশাপাশি নিরাপত্তা গবেষণার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করছে। উন্নয়নের গতি, ঝুঁকি মূল্যায়ন, মডেলের আচরণ পর্যবেক্ষণ এবং নীতিগত নিয়ন্ত্রণ—এসব বিষয় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এআই নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা গবেষকদের একটি অংশ কার্যকর নীতিমালা ও আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে। তবে এমন বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে বিভিন্ন দেশের সরকার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক সংস্থার ভূমিকা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এআই নিরাপত্তা নিয়ে প্রকাশিত ভয়-আশঙ্কাকে ‘প্রতারণা’ বলে অভিহিত করেছেন। ফলে এআইয়ের ঝুঁকি, নিয়ন্ত্রণ ও নীতিমালা নিয়ে প্রযুক্তি জগতের পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।

ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত এখনো নেই

এআই মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে কি না, তার নিশ্চিত উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। মানববিলুপ্তির সম্ভাবনা নিয়ে কিছু গবেষক সতর্ক করছেন, আবার অন্যরা এ ধরনের চরম পরিস্থিতির বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

তবে এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে নিরাপত্তা, সাইবার হামলা, ভুল লক্ষ্য নির্ধারণ এবং মানুষের অপব্যবহারের মতো ঝুঁকিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ কী হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে এআই কীভাবে তৈরি, নিয়ন্ত্রিত ও ব্যবহৃত হচ্ছে তার ওপর।

Comment / Reply From