এআই ব্যবহারে কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বিশ্বজুড়ে দ্রুত বিস্তার লাভ করলেও বাংলাদেশ এখনো এই প্রযুক্তির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় প্রস্তুত নয়। অক্সফোর্ড ইনসাইটসের এআই রেডিনেস র্যাংকিং অনুযায়ী, এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রস্তুতিতে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান বিশ্বে ৭৪তম। জাতীয় এআই স্ট্র্যাটেজি বা এআই পলিসি ২০২৪ এখনো খসড়া পর্যায়েই রয়েছে। তবুও বাস্তবতা হলো—দেশে এআইয়ের ব্যবহার থেমে নেই; বরং ব্যবহার ও অপব্যবহার দুটোই সমানতালে বাড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে ৫ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় ‘রেসপন্সিবল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ফর বাংলাদেশ: পলিসি অ্যান্ড ডিজাইন চ্যালেঞ্জেস’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা। এতে দেশের এআই ব্যবহারের বর্তমান অবস্থা, সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজির (আইআইটি) পরিচালক প্রফেসর ড. বি এম মইনুল হোসেনের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সভা শুরু হয়। আলোচনায় অংশ নেন টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. ইশতিয়াক আহমেদ, ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় আরবানা-শ্যাম্পেইনের সহকারী অধ্যাপক ড. শরিফা সুলতানা, ইউনেসকোর এআই এক্সপার্টস উইদাউট বর্ডারসের সদস্য ড. জুলকারনাইন জাহাঙ্গীর এবং অগমেডিক্স বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর রাশেদ মুজিব নোমান।
অবকাঠামো ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ
আলোচনার শুরুতে আইআইটির শিক্ষার্থী রুপালী তাসনিম সামাদ ও মেহেজাবীন হক এক গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন, যেখানে দেখা যায়—দেশে এআই পাইপলাইনের সঙ্গে একাডেমিয়া ও কর্মক্ষেত্রের সংযোগ এখনো দুর্বল। গবেষণায় এআই এথিকস নিয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনার অভাব, আধুনিক এআই কারিকুলামের ঘাটতি, জেন্ডার বৈষম্য এবং অটোমেটেড সিস্টেমের পরিবর্তে মানুষের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উঠে আসে।
ড. ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, বিদ্যুৎ ও পানিসম্পদের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশে এআই অবকাঠামো পরিকল্পনা করা অত্যন্ত জরুরি। ড. শরিফা সুলতানা এআই নীতিমালার অভাব এবং শিক্ষাব্যবস্থায় এআই নৈতিকতা অন্তর্ভুক্ত না করার ফলে বাড়তি ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন। অন্যদিকে, রাশেদ মুজিব নোমান দেশীয় এআই অবকাঠামো গড়ে তুলতে স্থানীয় ডেটার সংকটকে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেন।
তথ্য নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। দেশীয় ডেটা সেন্টারের অভাবে এখনো অনেক সংবেদনশীল তথ্য বিদেশি সার্ভারে সংরক্ষণ করতে হচ্ছে, যা গোপনীয়তার জন্য মারাত্মক হুমকি। তাই নিরাপদ এআই ব্যবস্থার জন্য দেশেই ডেটা সেন্টার ও অফলাইন ডেটাবেইস গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা
এআই খাতে নারীর অংশগ্রহণ এখনো সীমিত। দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এআই সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের মাত্র ১০–১৫ শতাংশ নারী, যা প্রযুক্তিখাতে জেন্ডার বৈষম্যের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। পাশাপাশি, অনেক ব্যবহারকারী এখনো ওয়েবসাইট বা অটোমেটেড সিস্টেমের বদলে সরাসরি মানুষের সঙ্গে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন—এটি এআই গ্রহণযোগ্যতার পথে আরেকটি বড় সামাজিক বাধা।
করণীয় কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, দায়িত্বশীল এআই ব্যবহারের জন্য জরুরি একটি শক্তিশালী ও বাস্তবায়নযোগ্য নীতিমালা। তথ্য গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে তথ্য নিরাপত্তা আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা দরকার। পাশাপাশি, এআই ব্যবহারে ‘হিউম্যান-ইন-দ্য-লুপ’ পদ্ধতি বাধ্যতামূলক করা উচিত, যাতে মানুষের যাচাই ছাড়া এআইয়ের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত না হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—দেশীয় তথ্যের ওপর প্রশিক্ষিত এআই ব্যবস্থা গড়ে তোলা। কারণ পক্ষপাতমুক্ত এআই পুরোপুরি সম্ভব না হলেও, স্থানীয় ডেটা ব্যবহার করলে সেই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়। এ জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী এআই ডেটা সেন্টার, দক্ষ মানবসম্পদ এবং একাডেমিয়া ও শিল্পখাতের যৌথ উদ্যোগ।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!