এক সেলফিতে ক্যানসারের ঝুঁকি বুঝবে এআই?
একটি সাধারণ মুখের ছবি বিশ্লেষণ করেই ক্যানসার রোগীর বেঁচে থাকার ঝুঁকি অনুমান করতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। একই সঙ্গে রোগীর চেহারা দেখে তাঁর বয়স কতটা বেশি বা কম মনে হচ্ছে, সে সম্পর্কেও ধারণা দিতে পারে নতুন এই প্রযুক্তি। চিকিৎসকদের আশা, ভবিষ্যতে রোগীর শারীরিক সক্ষমতা মূল্যায়ন এবং উপযুক্ত চিকিৎসাপদ্ধতি নির্ধারণে এটি সহায়ক হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ম্যাস জেনারেল ব্রিগহামের গবেষকেরা তৈরি করেছেন এআইভিত্তিক এই প্রযুক্তি। ‘ফাউন্ডেশন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ফর হেলথ রিকগনিশন-ফেস’ বা FAHR-Face নামের মডেলটি ৪ কোটির বেশি মুখের ছবি ব্যবহার করে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন বয়স ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের ছবি এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
২০২৬ সালের ১৯ অক্টোবর The Lancet Digital Health সাময়িকীতে গবেষণাটির ফল প্রকাশিত হয়। তবে প্রযুক্তিটি কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর নির্দিষ্ট তারিখ বা হাতে কত দিন সময় আছে, তা বলে দিতে পারে না। বরং ক্যানসার রোগীদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ও মৃত্যুঝুঁকি সম্পর্কে পরিসংখ্যানভিত্তিক পূর্বাভাস দেওয়াই এর উদ্দেশ্য। <Cite refs={["turn205362view0","turn205362view1","turn309454view0"]}/>
একই মডেল থেকে তৈরি দুটি এআই টুল
গবেষকেরা FAHR-Face মডেলের সাহায্যে দুটি পৃথক টুল তৈরি করেছেন। এগুলো মুখের ছবি বিশ্লেষণ করলেও কাজের ধরন এক নয়।
FAHR-FaceAge: মুখের ছবি দেখে একজন মানুষের দেখতে কত বছর বয়সী মনে হচ্ছে, তা অনুমান করে। এই বয়সকে প্রকৃত বয়সের সঙ্গে তুলনা করে গবেষকেরা তাঁর জৈবিক বয়স ও স্বাস্থ্যগত অবস্থার সম্ভাব্য ইঙ্গিত বোঝার চেষ্টা করেছেন। তবে চেহারার ভিত্তিতে পাওয়া বয়সই শরীরের প্রকৃত জৈবিক বয়সের চূড়ান্ত পরিমাপ নয়।
FAHR-FaceSurvival: এই টুল সরাসরি মুখের ছবি বিশ্লেষণ করে ক্যানসার রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ও মৃত্যুঝুঁকি অনুমান করে। অর্থাৎ, শুধু চেহারার বয়স অনুমান করে সেখান থেকে ঝুঁকি নির্ধারণ করার পরিবর্তে এটি ছবির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে পূর্বাভাস তৈরি করে।
একই মূল মডেল থেকে তৈরি হলেও টুল দুটি মুখের আলাদা অংশে গুরুত্ব দেয়। FAHR-FaceAge নাকের দুই পাশ থেকে ঠোঁটের কোণ পর্যন্ত বিস্তৃত ভাঁজ, চোখের কোটরের ওপরের কপাল এবং কপালের দুই পাশের অঞ্চল বিশ্লেষণ করে। অন্যদিকে, FAHR-FaceSurvival চোখের নিচের অংশ ও নাকের ওপরের সংযোগস্থলের আশপাশের বৈশিষ্ট্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়। <Cite refs={["turn205362view1","turn309454view0"]}/>
৪ কোটির বেশি ছবিতে প্রশিক্ষণ, ক্যানসার রোগীদের ওপর পরীক্ষা
গবেষকেরা প্রথমে বিপুলসংখ্যক মুখের ছবি থেকে মানুষের মুখের সাধারণ বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করার সক্ষমতা তৈরি করেন। পরে সেই মডেলকে নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যগত পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য প্রশিক্ষিত করা হয়।
জৈবিক বয়স অনুমানের জন্য একাধিক প্রকাশ্য ছবির ডেটাসেট ব্যবহার করা হয়েছে। আর ক্যানসার রোগীদের বেঁচে থাকার ঝুঁকি নির্ণয়ের টুলটি প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা হয় ক্যানসার আক্রান্ত ব্যক্তিদের ৩৪ হাজার ৩৬৩টি মুখের ছবি।
এরপর মডেলগুলোকে ক্যানসার রোগীদের পৃথক ডেটাসেটেও পরীক্ষা করা হয়। গবেষকদের লক্ষ্য ছিল, এআইয়ের পূর্বাভাস বিভিন্ন রোগী ও পরিস্থিতিতে কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করে, তা যাচাই করা।
হুগো অ্যার্টসের নেতৃত্বাধীন গবেষক দলের মতে, ৪ কোটির বেশি ছবি থেকে মুখের সাধারণ বৈশিষ্ট্য শেখার ফলে একই মূল মডেলকে জৈবিক বয়স ও বেঁচে থাকার ঝুঁকির মতো একাধিক স্বাস্থ্যসূচক নির্ধারণের জন্য ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে। প্রতিটি কাজের জন্য শুরু থেকে নতুন মডেল তৈরির প্রয়োজন পড়ে না। <Cite refs={["turn205362view0","turn309454view0"]}/>
যাঁদের দেখতে বয়স বেশি, তাঁদের মৃত্যুঝুঁকিও বেশি?
যুক্তরাষ্ট্রে রেডিওথেরাপি নেওয়া ক্যানসার রোগীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখতে পান, এআইয়ের হিসাবে যাঁদের বয়স প্রকৃত বয়সের তুলনায় অন্তত পাঁচ বছর বেশি মনে হয়েছে, তাঁদের মৃত্যুঝুঁকি তুলনামূলক বেশি ছিল।
গড়ে চার বছর ধরে পর্যবেক্ষণের ফল অনুযায়ী, এআইয়ের অনুমানে যাঁদের প্রকৃত বয়সের চেয়ে অন্তত পাঁচ বছর বেশি বয়সী মনে হয়েছে, তাঁদের মৃত্যুঝুঁকি অন্য রোগীদের তুলনায় ২১ শতাংশ বেশি ছিল। বিপরীতে, যাঁদের বয়স প্রকৃত বয়সের চেয়ে অন্তত পাঁচ বছর কম মনে হয়েছে, তাঁদের মৃত্যুঝুঁকি ছিল ১৭ শতাংশ কম।
এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই পরিসংখ্যান নির্দিষ্ট রোগীগোষ্ঠীর মধ্যে পাওয়া সম্পর্ক তুলে ধরে। এর অর্থ এই নয় যে চেহারায় বয়স বেশি মনে হলেই কারও মৃত্যুঝুঁকি নিশ্চিতভাবে বেড়ে যাবে। একইভাবে, দেখতে কম বয়সী মনে হলেই কেউ বেশি দিন বাঁচবেন, এমন নিশ্চয়তাও নেই।
অন্যদিকে, FAHR-FaceSurvival টুলের ফলাফলে সর্বোচ্চ ঝুঁকির দলে থাকা রোগীদের মৃত্যুঝুঁকি সর্বনিম্ন ঝুঁকির দলের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি পাওয়া যায়। এই ফলাফলও দেখায়, মুখের ছবিতে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে, যা রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। <Cite refs={["turn205362view1","turn309454view0"]}/>
চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে কীভাবে কাজে লাগতে পারে?
ক্যানসারের চিকিৎসায় রোগীর বয়সের পাশাপাশি তাঁর সামগ্রিক শারীরিক সক্ষমতা ও দুর্বলতা বিবেচনা করা জরুরি। একই ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত দুজন রোগীর চিকিৎসা সহ্য করার ক্ষমতা কিংবা জটিলতার ঝুঁকি এক রকম নাও হতে পারে।
বিশেষ করে রেডিওথেরাপি, বড় অস্ত্রোপচার কিংবা শরীরজুড়ে কাজ করে এমন ওষুধ প্রয়োগের আগে রোগীর শারীরিক সক্ষমতা বোঝা চিকিৎসকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ম্যাস জেনারেল ব্রিগহামের রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট রেমন্ড ম্যাকের মতে, মুখের ছবি ব্যবহার করে স্বাস্থ্য মূল্যায়নকে আরও পরিমাপযোগ্য, ধারাবাহিক ও সহজলভ্য করার লক্ষ্য রয়েছে। এতে রোগীর ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুযায়ী চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা মিলতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, প্রচলিত পরীক্ষার ফলাফলের পাশাপাশি এআইয়ের দেওয়া ঝুঁকির তথ্য চিকিৎসককে রোগীর শারীরিক দুর্বলতা সম্পর্কে আরও প্রশ্ন করতে বা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা বিবেচনা করতে সাহায্য করতে পারে। তবে শুধু এআইয়ের পূর্বাভাসের ওপর নির্ভর করে চিকিৎসা শুরু করা, বন্ধ করা কিংবা পরিবর্তন করা উচিত নয়। <Cite refs={["turn205362view0","turn205362view2"]}/>
প্রযুক্তিটি কি এখনই ব্যবহার করা যাবে?
গবেষণার ফল আশাব্যঞ্জক হলেও প্রযুক্তিটি এখনই নিয়মিত চিকিৎসায় ব্যাপকভাবে ব্যবহারের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত—এমনটি বলা যাচ্ছে না। আরও বিস্তৃত রোগীগোষ্ঠীর ওপর পরীক্ষা এবং বিভিন্ন হাসপাতাল ও বাস্তব পরিস্থিতিতে এর নির্ভরযোগ্যতা যাচাই প্রয়োজন।
এ ছাড়া মুখের ছবি থেকে পাওয়া পূর্বাভাসের পেছনে ঠিক কোন জৈবিক বৈশিষ্ট্য কাজ করছে, তা পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। চেহারায় বয়সের ছাপ, শারীরিক দুর্বলতা কিংবা রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবর্তন—কোন বৈশিষ্ট্য কতটা ভূমিকা রাখছে, তা বোঝার জন্য আরও গবেষণা দরকার।
বয়স, লিঙ্গ, জাতিগোষ্ঠী ও ক্যানসারের ধরনভেদে মডেলটির কার্যকারিতা যাচাই করা হলেও বাস্তব চিকিৎসায় ব্যবহারের আগে নিরপেক্ষ ও বৃহত্তর পরিসরে মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি রোগীর মুখের ছবি সংরক্ষণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিশ্চিত করাও জরুরি। <Cite refs={["turn205362view1","turn309454view0"]}/>
সেলফি নয়, চিকিৎসার সহায়ক হতে পারে এআই
একটি সাধারণ মুখের ছবি থেকে ক্যানসার রোগীর বেঁচে থাকার ঝুঁকি অনুমান করার এই প্রযুক্তি স্বাস্থ্যসেবায় এআইয়ের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে সহজলভ্য উপায়ে রোগীর শারীরিক সক্ষমতা সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য পাওয়ার সুযোগ থাকলে চিকিৎসার পরিকল্পনা আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক হতে পারে।
তবে মুখের ছবি কোনো রোগ নির্ণয়ের বিকল্প নয় এবং এটি দিয়ে কারও আয়ুষ্কাল নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায় না। গবেষকদের লক্ষ্যও চিকিৎসকের সিদ্ধান্তকে প্রতিস্থাপন করা নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অতিরিক্ত তথ্য সরবরাহ করা।
প্রযুক্তিটি ভবিষ্যতে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে আরও গবেষণা, বাস্তব ক্ষেত্রে যাচাই এবং নিরাপদ ব্যবহারের ওপর। একটি সেলফি হয়তো রোগীর স্বাস্থ্য সম্পর্কে নতুন কিছু ইঙ্গিত দিতে পারে, কিন্তু চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব চিকিৎসকেরই।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!