Dark Mode
Image
  • Tuesday, 03 November 2026
করোনার পূর্বাভাস নয়, বইটির আসল রহস্য অন্যখানে!

করোনার পূর্বাভাস নয়, বইটির আসল রহস্য অন্যখানে!

করোনার পূর্বাভাস ছিল ১৯৮১ সালের উপন্যাসে? ‘দ্য আইজ অব ডার্কনেস’-এর রহস্য

কোনো ঘটনা ঘটার বহু বছর আগে একটি উপন্যাসে তার ইঙ্গিত পাওয়া গেলে মানুষের কৌতূহল তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারি ছড়িয়ে পড়ার পর এমনই আলোচনায় আসে মার্কিন লেখক ডিন কুনজের থ্রিলার উপন্যাস ‘দ্য আইজ অব ডার্কনেস’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে দাবি, ১৯৮১ সালে প্রকাশিত এই বইতেই নাকি চীনের উহান শহর থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।

বইটিতে ‘উহান-৪০০’ নামের একটি কাল্পনিক ভাইরাসের উল্লেখ রয়েছে, যা চীনের একটি গোপন গবেষণাগারে তৈরি জৈব অস্ত্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। নামের সঙ্গে উহান শহরের মিল থাকায় বিষয়টি অনেককে বিস্মিত করে। কিন্তু বইটির প্রকৃত ইতিহাস খতিয়ে দেখলে সামনে আসে আরও কিছু চমকপ্রদ তথ্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবির সব অংশ একই বই থেকে নেওয়া নয়।

‘দ্য আইজ অব ডার্কনেস’-এর গল্প কী নিয়ে?

১৯৮১ সালে মার্কিন লেখক ডিন কুনজ ‘লেই নিকোলস’ ছদ্মনামে প্রকাশ করেন ‘দ্য আইজ অব ডার্কনেস’ উপন্যাসটি। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ক্রিস্টিনা ইভানস নামের এক মা, যিনি তাঁর ছেলে ড্যানির রহস্যময় মৃত্যুর সত্য উদ্‌ঘাটনের চেষ্টা করেন।

একটি ক্যাম্পিং অভিযানে যাওয়ার পর ড্যানি এবং দলের অন্য সদস্যরা অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মারা যায় বলে জানানো হয়। কিন্তু ছেলের মৃত্যু মেনে নিতে পারেন না ক্রিস্টিনা। তাঁর মনে সন্দেহ তৈরি হয়, ড্যানি হয়তো এখনো বেঁচে আছে।

ছেলের নিখোঁজ হওয়ার রহস্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে ক্রিস্টিনা এমন একটি গোপন সামরিক গবেষণাগারের সন্ধান পান, যেখানে প্রাণঘাতী জৈব অস্ত্র তৈরির কাজ চলছিল বলে উপন্যাসে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানেই উঠে আসে ‘৪০০’ নামের একটি কাল্পনিক ভাইরাসের প্রসঙ্গ।

১৯৮১ সালের সংস্করণে কিন্তু নাম ছিল ‘গোর্কি-৪০০’!

এখানেই রয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। উপন্যাসটির প্রথম প্রকাশিত সংস্করণে ভাইরাসটির নাম ছিল ‘গোর্কি-৪০০’ (Gorki-400), ‘উহান-৪০০’ নয়। সেই সংস্করণে ভাইরাসটির উৎপত্তিস্থল হিসেবে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের গোর্কি শহরের কথা বলা হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত সংশোধিত সংস্করণে ভাইরাসটির নাম পরিবর্তন করে ‘উহান-৪০০’ করা হয়। সে সময় স্নায়ুযুদ্ধের অবসান এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বইটির এই পরিবর্তন করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

অর্থাৎ, ১৯৮১ সালের মূল সংস্করণেই উহান শহরের নাম ছিল—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন দাবি সঠিক নয়। পরবর্তী সংস্করণে নাম পরিবর্তনের বিষয়টি না জানার কারণেই বিভ্রান্তি আরও ছড়িয়ে পড়ে।

২০২০ সালের মহামারির পূর্বাভাসের কথাটি কোথা থেকে এল?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবির আরেকটি অংশ আরও বিভ্রান্তিকর। সেখানে বলা হয়েছিল, ‘দ্য আইজ অব ডার্কনেস’ বইয়ের ৩১২ নম্বর পৃষ্ঠায় ২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে নিউমোনিয়ার মতো একটি রোগ ছড়িয়ে পড়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।

বাস্তবে এই বক্তব্যটি ডিন কুনজের উপন্যাসের অংশ নয়। এটি এসেছে সিলভিয়া ব্রাউনের ২০০৮ সালে প্রকাশিত ‘এন্ড অব ডেজ: প্রেডিকশনস অ্যান্ড প্রফেসিস অ্যাবাউট দ্য এন্ড অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামের অন্য একটি বই থেকে।

অর্থাৎ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুটি আলাদা বইয়ের তথ্য একসঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। একটি বইয়ে ছিল কাল্পনিক ‘উহান-৪০০’ ভাইরাসের গল্প, অন্য বইয়ে ছিল ২০২০ সালের দিকে নিউমোনিয়াসদৃশ অসুস্থতা ছড়িয়ে পড়ার একটি ভবিষ্যদ্বাণীমূলক বক্তব্য। দুই তথ্যকে এক করে উপস্থাপন করায় তৈরি হয় করোনাভাইরাসের পূর্বাভাস দেওয়ার গল্প।

কাল্পনিক উহান-৪০০ ও বাস্তব কোভিড-১৯ কি একই?

উপন্যাসের ভাইরাসটির নাম ও উৎপত্তিস্থলের সঙ্গে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের শহরের মিল থাকলেও দুটির বৈশিষ্ট্য এক নয়।

ডিন কুনজের উপন্যাসে উহান-৪০০-কে একটি পরিকল্পিত জৈব অস্ত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে। সেখানে ভাইরাসটির সংক্রমণ ও প্রাণঘাতী প্রভাব সম্পর্কে অত্যন্ত ভয়াবহ বর্ণনা রয়েছে। উপন্যাস অনুযায়ী, এটি মানুষের স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্কের কার্যক্রমকে আক্রমণ করে এবং সংক্রমিত ব্যক্তির মৃত্যুর আশঙ্কা অত্যন্ত বেশি।

অন্যদিকে, কোভিড-১৯ হলো SARS-CoV-2 নামের একটি বাস্তব করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট রোগ। এটি প্রধানত শ্বাসতন্ত্রকে আক্রান্ত করে। আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে মৃদু উপসর্গ থেকে শুরু করে গুরুতর অসুস্থতা ও মৃত্যুও ঘটতে পারে। তবে উপন্যাসের কাল্পনিক ভাইরাসের মতো এর সংক্রমণ ও মৃত্যুর ধরন নয়।

এ ছাড়া উপন্যাসে বর্ণিত ভাইরাসটি সামরিক গবেষণাগারে তৈরি জৈব অস্ত্র হলেও কোভিড-১৯ সম্পর্কে এমন কোনো সিদ্ধান্ত বইটির সঙ্গে মিলিয়ে প্রমাণ করা যায় না। একটি কাল্পনিক গল্পের সঙ্গে বাস্তব ঘটনার কিছু নামের মিল থাকা কোনো ঘটনার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নয়।

তাহলে কেন এত আলোচনায় এসেছিল বইটি?

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের সময় মানুষ যখন অজানা এক মহামারির মুখোমুখি, তখন পুরোনো বইয়ে ‘উহান-৪০০’ নামটি খুঁজে পাওয়া অনেকের কাছেই বিস্ময়কর মনে হয়েছিল। বইয়ের কিছু অংশের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে উপন্যাসটি নতুন করে পাঠকদের আগ্রহের কেন্দ্রে চলে আসে।

তবে যাচাই-বাছাইয়ে দেখা যায়, ভাইরাসের নাম পরিবর্তনের ইতিহাস, উপন্যাসের কাল্পনিক কাহিনি এবং অন্য একটি বইয়ের ভবিষ্যদ্বাণী—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে মিশিয়ে প্রচার করা হয়েছিল।

কল্পনা আর বাস্তবতার পার্থক্য বোঝা জরুরি

বিজ্ঞান কল্পকাহিনি ও থ্রিলার সাহিত্যে লেখকেরা অনেক সময় ভবিষ্যতের প্রযুক্তি, মহামারি কিংবা বৈশ্বিক সংকট নিয়ে কল্পনা করেন। বাস্তবে পরে কোনো ঘটনার সঙ্গে সেই কল্পনার কিছু মিল পাওয়া গেলে তা আলোচনার জন্ম দেয়। কিন্তু সামান্য মিল থাকলেই সেটিকে ভবিষ্যদ্বাণী বলা যায় না।

‘দ্য আইজ অব ডার্কনেস’ উপন্যাসের ঘটনাও তেমন। উহান-৪০০ নামটি মানুষের কৌতূহল বাড়ালেও বইটি ১৯৮১ সালে কোভিড-১৯ মহামারির সঠিক পূর্বাভাস দিয়েছিল—এমন দাবি সত্য নয়।

বরং ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া চমকপ্রদ তথ্য বিশ্বাস করার আগে তার উৎস, সময় ও প্রেক্ষাপট যাচাই করা কতটা জরুরি।

 

Comment / Reply From