কেন বেশিরভাগ মানুষ ডান হাত ব্যবহার করে?
কেন পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ ডান হাত ব্যবহার করে? জানুন বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা
খেয়াল করলে দেখা যাবে, পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষই দৈনন্দিন কাজের জন্য ডান হাত ব্যবহার করেন। লেখালেখি, খাওয়া, বল ছোড়া কিংবা বিভিন্ন সূক্ষ্ম কাজ—সব ক্ষেত্রেই ডান হাতের ব্যবহার বেশি। কিন্তু কেন এমন হয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বহু বছর ধরে গবেষণা করছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, এর পেছনে রয়েছে মানব মস্তিষ্কের গঠন, বিবর্তনের ইতিহাস এবং ভাষার বিকাশের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
মস্তিষ্ক থেকেই শুরু হাতের পক্ষপাত
যুক্তরাজ্যের লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ নাটালি উয়োমিনির মতে, ইতিহাসে এমন কোনো মানবগোষ্ঠীর সন্ধান পাওয়া যায়নি যেখানে বামহাতিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন।
মানব মস্তিষ্কের বাম গোলার্ধ শরীরের ডান অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, আর ডান গোলার্ধ নিয়ন্ত্রণ করে শরীরের বাম অংশ। এই স্নায়বিক সংযোগের কারণেই অধিকাংশ মানুষের ডান হাত বেশি দক্ষ হয়ে ওঠে।
কোটি বছরের বিবর্তনের প্রভাব
গবেষকদের ধারণা, মস্তিষ্কের দুই গোলার্ধে কাজের বিভাজন প্রায় ৫০ কোটি বছর আগেই শুরু হয়েছিল।
বাম গোলার্ধ মূলত নিয়মিত ও অভ্যাসগত কাজ পরিচালনা করে, অন্যদিকে ডান গোলার্ধ পরিবেশের আকস্মিক বিপদ বা হুমকি শনাক্ত করতে বেশি সক্রিয় থাকে। মাছ, ব্যাঙ ও বিভিন্ন পাখির মধ্যেও একই ধরনের স্নায়বিক পক্ষপাত লক্ষ্য করা গেছে।
সোজা হয়ে হাঁটা বদলে দেয় হাতের ব্যবহার
জ্ঞানবিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, যখন মানুষের পূর্বপুরুষ চার পায়ে হাঁটা ছেড়ে দুই পায়ে সোজা হয়ে হাঁটতে শুরু করে, তখন হাত দুটি নতুন কাজে ব্যবহারের সুযোগ পায়।
এই সময় থেকেই একটি নির্দিষ্ট হাত বেশি ব্যবহারের প্রবণতা তৈরি হতে থাকে। শিম্পাঞ্জিদের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, চার পায়ে চলার সময় তারা কোনো নির্দিষ্ট হাতকে প্রাধান্য দেয় না। কিন্তু সোজা হয়ে দাঁড়ালে একটি হাত বেশি ব্যবহার করতে শুরু করে।
প্রাচীন হাতিয়ারেও মিলেছে ডানহাতির প্রমাণ
প্রাগৈতিহাসিক পাথরের হাতিয়ার বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, প্রায় ১৫ লাখ বছর আগে হোমো হ্যাবিলিস ও হোমো ইরেক্টাস প্রজাতির মানুষের তৈরি কিছু হাতিয়ারে ডানহাতি ব্যবহারের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।
আর প্রায় ৬ লাখ বছর আগে হোমো হাইডেলবার্গেনসিস প্রজাতির দাঁতের ক্ষয়ের ধরন বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা ধারণা করেছেন, তারা প্রধানত ডান হাত দিয়েই খাবার মুখে তুলতেন।
ভাষার বিকাশও হতে পারে বড় কারণ
বিজ্ঞানীদের একটি জনপ্রিয় ধারণা হলো, ভাষার বিকাশ ডান হাতের প্রাধান্য আরও শক্তিশালী করেছে।
কারণ ভাষা নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রও মূলত মস্তিষ্কের বাম গোলার্ধে অবস্থিত, যে অংশ আবার ডান হাত নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে ভাষা ও হাতের দক্ষতার মধ্যে একটি বিবর্তনগত সম্পর্ক তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
তবে এই তত্ত্বের শতভাগ প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
বামহাতিরা কি কোনো দিক থেকে পিছিয়ে?
গবেষণা বলছে, একেবারেই নয়।
১৯৭৭ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, বামহাতি হওয়া কোনো দুর্বলতার লক্ষণ নয়। বরং কিছু ক্ষেত্রে বামহাতিরা মস্তিষ্কে আঘাতের পর দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন।
এ ছাড়া বক্সিং, কুস্তি কিংবা অন্যান্য লড়াইভিত্তিক খেলায় বামহাতিদের আকস্মিক আক্রমণের সুবিধা থাকায় তারা প্রতিপক্ষের তুলনায় বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন।
এখনো রয়ে গেছে রহস্য
হাতের পক্ষপাত শুধু মানুষের মধ্যেই নয়, বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যেও দেখা যায়। তবে মানুষের ক্ষেত্রে প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষের ডানহাতি হওয়ার বিষয়টি বিবর্তনের অন্যতম বিস্ময় হিসেবে বিবেচিত।
বিজ্ঞানীদের মতে, সোজা হয়ে হাঁটা, হাতিয়ার তৈরি এবং ভাষার বিকাশ—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিবর্তনীয় পরিবর্তনের সমন্বয়েই মানুষের মধ্যে ডান হাত ব্যবহারের প্রবণতা এত বেশি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!