Dark Mode
Image
  • Thursday, 29 January 2026

গুজবের আড়ালে রক্তদানের সংকট: কেন মিলছে না প্রয়োজনীয় ডোনার?

গুজবের আড়ালে রক্তদানের সংকট: কেন মিলছে না প্রয়োজনীয় ডোনার?

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও রক্তের সংকট এখনো একটি বড় বাস্তবতা। ডায়ালাইসিস, হার্ট সার্জারি, সন্তান প্রসব, ক্যানসার, টিউমার কিংবা থ্যালাসেমিয়ার মতো রোগে প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণ রক্তের প্রয়োজন হয়। অথচ প্রয়োজনের তুলনায় স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতা পাওয়া যাচ্ছে না।

এই সংকট মোকাবিলায় দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক সংগঠন, ফাউন্ডেশন, কোয়ান্টাম, সন্ধানীসহ জেলা ও এলাকাভিত্তিক অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে। রাস্তায় রাস্তায় ক্যাম্পেইন, ব্লাড গ্রুপ নির্ণয়, রক্ত সংগ্রহ—সবই চলছে মানুষের জীবন বাঁচানোর তাগিদে। তবু প্রশ্ন থেকেই যায়—কেন এত ডোনার সংকট?

ভয় আর গুজবই বড় বাধা

শৈশব থেকেই রক্তদান নিয়ে একধরনের অজানা ভয় আমাদের সমাজে গেঁথে গেছে। অনেক অভিভাবকের ধারণা—রক্ত দিলে শরীর দুর্বল হয়ে যায়, বড় কোনো ক্ষতি হতে পারে। বাস্তবে যাঁরা এসব কথা বলেন, তাঁদের অনেকেই কখনো রক্ত দেননি, বরং নিজের সন্তানকেও নিরুৎসাহিত করেন। অথচ প্রয়োজনের সময় ঠিক তাঁরাই রক্তদাতার খোঁজ করেন।

এই ভুল ধারণা ও গুজব প্রজন্মের পর প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ছে। একটি পরিবারে তিনজনকে রক্ত দিতে নিষেধ করা হলে, তাঁদের মাধ্যমে আরও বহু মানুষ একই ভ্রান্ত ধারণায় প্রভাবিত হয়। এভাবেই সমাজ ধীরে ধীরে মানবিক সহায়তা থেকে পিছিয়ে পড়ছে।

 বাস্তবতার নির্মম চিত্র

হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে অসহায় রোগীর স্বজনেরা তরুণদের অনুরোধ করছেন—“ভাই, খুব জরুরি রক্ত লাগবে।” কিন্তু উত্তর আসে—“ভয় লাগে”, “পরিবার মানা করেছে।” এমনকি বিনা খরচে রক্তের গ্রুপ পরীক্ষার প্রস্তাবও অনেককে রাজি করাতে পারে না। এই দৃশ্য আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন তোলে।

রক্তযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা

যাঁরা স্বেচ্ছায় রক্ত দেন, তাঁরা প্রকৃত অর্থেই ‘রক্তযোদ্ধা’। একজন রোগীর মুখে হাসি ফেরানোর তৃপ্তি তাঁদের প্রাপ্তি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক জায়গায় ডোনারদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার সুযোগ নেই, সম্মানজনক আচরণও সব সময় নিশ্চিত হয় না। কোথাও কোথাও টাকার বিনিময়ে রক্ত, ভুয়া প্রতিশ্রুতি ও প্রতারণা এই মহৎ কাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন টিকিয়ে রাখা জরুরি

বিশ্ববিদ্যালয় ও এলাকাভিত্তিক ব্লাড ডোনেশন ক্লাবগুলো সচেতনতা তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখছে। তবে অর্থনৈতিক সংকট, জনবল ও ব্যবস্থাপনার অভাবে অনেক সংগঠন হারিয়ে যাচ্ছে। এসব সংগঠন টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় মানুষ ও জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা।

সমাধানের পথ

পরিবারের ভুল ধারণা ভাঙা, শিক্ষকদের সচেতন ভূমিকা, নতুন প্রজন্মকে বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য জানানো—এসবের মাধ্যমেই রক্তদানে আগ্রহ বাড়ানো সম্ভব। তাতে একদিকে যেমন মানুষের প্রাণ বাঁচবে, অন্যদিকে প্রতারণাও কমবে।

মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে জরুরি। তখনই “মানুষ মানুষের জন্য”—এই কথার প্রকৃত অর্থ নতুন করে ফিরে আসবে।

Comment / Reply From