চুলার তাপেই রান্না, জ্বালানি সাশ্রয়
গ্যাস-বিদ্যুৎ ছাড়াই রান্না! তাপ ধরে রাখে বিশেষ ব্যাগ
রান্নার জন্য চুলা জ্বালিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়—এমন ধারণা বদলে দিতে পারে বিশেষ ধরনের তাপ-নিরোধক রান্নার ব্যাগ। খাবার একবার ফুটিয়ে নেওয়ার পর ঢাকনাসহ পাত্রটি এই ব্যাগের ভেতরে রাখলে জমে থাকা তাপ কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে রান্নার প্রক্রিয়া চালানো যায়। এতে পরবর্তী সময়ে আর গ্যাস, কাঠ কিংবা বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় না।
ক্যামেরুনে তৈরি এ ধরনের তাপ-নিরোধক রান্নার ব্যাগ এখন পরিবেশবান্ধব রান্নার বিকল্প হিসেবে আলোচনায় এসেছে। জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির উদ্যোক্তা মিরান্দে কুইচু ফেউবা এমবাতশু হাতে তৈরি করছেন বিশেষ এই ব্যাগ। এর মাধ্যমে রান্নার জ্বালানি খরচ সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইয়াউন্দে শহর ও অনলাইনে এ ধরনের দুই হাজারের বেশি ব্যাগ বিক্রি হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
কীভাবে কাজ করে রান্নার ব্যাগ?
ব্যাগটির কার্যপদ্ধতি অনেকটা ‘স্লো কুকার’ বা ধীরগতিতে রান্না করার পাত্রের মতো। তবে এতে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে তাপ তৈরি করা হয় না। বরং আগে থেকে খাবার গরম করে পাত্রের মধ্যে যে তাপ তৈরি হয়, সেটিই ধরে রেখে রান্না চালিয়ে যাওয়া হয়।
ব্যাগটির ভেতরে থাকে তাপ-নিরোধক উপাদান, যা পাত্রের তাপ দ্রুত বাইরে বেরিয়ে যেতে বাধা দেয়। ফলে খাবার ধীরে ধীরে রান্না হতে থাকে।
এ পদ্ধতিতে সাধারণত প্রথমে চুলায় খাবার ফুটিয়ে নিতে হয়। এরপর পাত্রটি দ্রুত ব্যাগের ভেতরে রেখে মুখ ভালোভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। খাবারের ধরন, পরিমাণ, প্রাথমিক তাপমাত্রা এবং ব্যাগের কার্যকারিতার ওপর নির্ভর করে রান্না সম্পন্ন হতে কত সময় লাগবে।
কোন কোন খাবার রান্না করা যায়?
এই ধরনের ব্যাগে ভাত, ডাল, মাংস এবং স্যুপের মতো খাবার রান্না করা সম্ভব। যেসব খাবার কিছু সময় ধরে তাপের মধ্যে থাকলে ধীরে ধীরে সেদ্ধ হয়, সেগুলোর ক্ষেত্রে পদ্ধতিটি কাজে লাগতে পারে।
তবে সব খাবারের জন্য রান্নার সময় এক নয়। খাবার পুরোপুরি সেদ্ধ হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে মাংস ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ খাবারের ক্ষেত্রে নিরাপদ রান্নার তাপমাত্রা বজায় রাখতে হবে। তাই শুধু নির্দিষ্ট সময় পার হয়েছে বলে খাবার তৈরি হয়ে গেছে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
জ্বালানি সাশ্রয় হতে পারে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত
এই পদ্ধতির বড় সুবিধা হলো, খাবার ফুটে ওঠার পর দীর্ঘ সময় চুলা জ্বালিয়ে রাখতে হয় না। ফলে প্রচলিত রান্নার তুলনায় জ্বালানির ব্যবহার কমানো সম্ভব হতে পারে।
ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনে ক্যামেরুনে তৈরি ব্যাগগুলোর মাধ্যমে জ্বালানি ব্যবহার সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ কমানোর সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। একই ধরনের তাপ-ধরে-রাখা প্রযুক্তি ব্যবহার করা দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়ান্ডারব্যাগের প্রস্তুতকারকেরাও জ্বালানি সাশ্রয়ের দাবি করেছে। তবে বাস্তবে কতটা সাশ্রয় হবে, তা রান্নার ধরন, ব্যবহারকারীর অভ্যাস ও স্থানীয় পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।
পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্যও সম্ভাব্য সুফল
অনেক এলাকায় রান্নার প্রধান জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার করা হয়। তাপ-নিরোধক ব্যাগ দিয়ে রান্নার সময় কম কাঠ পোড়ানোর প্রয়োজন হলে জ্বালানি সংগ্রহের খরচ কমতে পারে। পাশাপাশি কাঠ পোড়ানোর ফলে তৈরি ধোঁয়ার সংস্পর্শও কমানো সম্ভব।
বিশেষ করে যেসব বাড়িতে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা নেই, সেখানে রান্নার ধোঁয়া শ্বাসতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। রান্নার সময় চুলা কমক্ষণ জ্বালানোর ফলে ধোঁয়ার সংস্পর্শ কমতে পারে, যদিও এর প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে কোন ধরনের চুলা ও জ্বালানি ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর।
এ ছাড়া কাঠের ব্যবহার কমলে বনসম্পদের ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। তাই এ ধরনের প্রযুক্তি শুধু খরচ সাশ্রয়ের উপায় নয়, বরং পরিবেশবান্ধব রান্নার ব্যবস্থার অংশ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
নতুন নয়, তবে এখনও প্রাসঙ্গিক প্রযুক্তি
তাপ ধরে রেখে খাবার রান্নার ধারণাটি একেবারে নতুন নয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় উদ্ভাবিত ‘ওয়ান্ডারব্যাগ’ও একই নীতিতে কাজ করে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালে উদ্যোক্তা সারাহ কলিন্স এই পণ্যটি তৈরি করেন। রান্নার পাত্রকে বিশেষ তাপ-নিরোধক ব্যাগের মধ্যে রাখার মাধ্যমে অতিরিক্ত জ্বালানি ছাড়াই রান্না চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
ক্যামেরুনে তৈরি ব্যাগগুলোও একই ধরনের ধারণাকে স্থানীয় উপকরণ ও হাতে তৈরির পদ্ধতির সঙ্গে যুক্ত করেছে। এতে নতুন শিল্পোদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে তৈরি পরিবেশবান্ধব পণ্যের বাজারও গড়ে উঠছে।
জ্বালানির দাম, বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং রান্নার ধোঁয়াজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে বিকল্প রান্নাপদ্ধতির গুরুত্ব বাড়ছে। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে সঠিক ব্যবহার, নিরাপদ রান্না এবং পণ্যের মানের ওপর।
সব মিলিয়ে, তাপ-নিরোধক রান্নার ব্যাগ দেখায় যে রান্নার জন্য শুধু নতুন শক্তির উৎস তৈরি করাই নয়, আগে থেকে পাওয়া তাপকে দক্ষতার সঙ্গে ধরে রাখাও জ্বালানি সাশ্রয়ের কার্যকর উপায় হতে পারে।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!