বিরিয়ানির হাঁড়িতে লাল কাপড় কেন?
পুরান ঢাকার অলিগলি কিংবা রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক ধরে হাঁটছেন। হঠাৎ নাকে এল বিরিয়ানির পরিচিত সুবাস। চোখ ফেরাতেই দেখা গেল, দোকানের সামনে বড় একটি হাঁড়ি, যার চারপাশ উজ্জ্বল লাল কাপড়ে মোড়ানো। ঢাকনা বন্ধ থাকলেও এই দৃশ্য দেখেই অনেকের বুঝতে বাকি থাকে না, হাঁড়ির ভেতরে রয়েছে গরম বিরিয়ানি।
শুধু রেস্তোরাঁ বা খাবারের দোকানেই নয়, বিয়ে, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা বড় কোনো আয়োজনের রান্নাঘরেও বিরিয়ানির হাঁড়ি লাল কাপড়ে জড়িয়ে রাখতে দেখা যায়। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই দৃশ্য এখন বিরিয়ানি সংস্কৃতিরই একটি পরিচিত অংশ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিরিয়ানির হাঁড়িতে লাল কাপড়ই কেন ব্যবহার করা হয়? এর পেছনে কি রয়েছে মুঘল আমলের কোনো ঐতিহ্য, নাকি ব্যবহারিক কোনো কারণ?
মুঘল আমলের ঐতিহ্যের সঙ্গে কি সম্পর্ক রয়েছে?
উপমহাদেশে বিরিয়ানির বিস্তার মুঘল ও নবাবি রান্নার ইতিহাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। তাই বিরিয়ানির হাঁড়িতে লাল কাপড় ব্যবহারের রীতিকেও অনেকে সেই সময়ের খাদ্য পরিবেশনের সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করেন।
প্রচলিত একটি ধারণা অনুযায়ী, মুঘল দরবারে খাবার পরিবেশনের সময় পাত্রের ধরন অনুসারে বিভিন্ন রঙের কাপড় ব্যবহারের রীতি ছিল। সম্রাট হুমায়ূনের আমলে রূপার পাত্র লাল কাপড়ে এবং অন্য ধাতব বা চিনামাটির পাত্র সাদা কাপড়ে ঢেকে পরিবেশন করা হতো বলে কিছু বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে মুঘল দরবার ও লখনউয়ের নবাবি সংস্কৃতিতেও এ ধরনের রীতির প্রভাব পড়েছিল বলে মনে করা হয়। এই ঐতিহ্য থেকেই বিরিয়ানির হাঁড়িতে লাল কাপড় ব্যবহারের প্রচলন শুরু হয়েছে—এমন ধারণাও রয়েছে।
তবে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ সীমিত। ফলে লাল কাপড়ে বিরিয়ানির হাঁড়ি মোড়ানোর রীতির উৎপত্তি যে নিশ্চিতভাবেই মুঘল আমলে, তা বলা যায় না। এটি প্রচলিত একটি ব্যাখ্যা, চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত ইতিহাস নয়।
হাঁড়ি গরম রাখতেও কাজে লাগে কাপড়
লাল কাপড় ব্যবহারের পেছনে ঐতিহ্যের পাশাপাশি ব্যবহারিক কারণও থাকতে পারে। বিরিয়ানি রান্নার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হলো দমে রান্না করা। এতে চাল, মাংস, আলু, ঘি ও মসলার বিভিন্ন স্তর তৈরি করে হাঁড়ির মুখ বন্ধ করে অল্প আঁচে রান্না করা হয়। এভাবে বাষ্প ও তাপের সাহায্যে উপকরণগুলো ভালোভাবে সেদ্ধ হয় এবং স্বাদ একে অন্যের সঙ্গে মিশে যায়।
রান্না শেষ হওয়ার পরও বিরিয়ানি কিছু সময় গরম রাখার প্রয়োজন হয়, বিশেষ করে যখন একসঙ্গে অনেক মানুষের জন্য খাবার প্রস্তুত করা হয়। বড় হাঁড়ির চারপাশে কাপড় জড়িয়ে রাখলে তাপ কিছুটা ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে। ধুলাবালি থেকেও হাঁড়িকে আড়াল করা যায়।
আধুনিক তাপ ধরে রাখার সরঞ্জাম সহজলভ্য হওয়ার আগে কাপড় ব্যবহার করা ছিল তুলনামূলক সহজ ও কম খরচের একটি পদ্ধতি। তবে কাপড় নিজে কোনো বিশেষ তাপ উৎপাদন করে না; এটি মূলত তাপের অপচয় কিছুটা কমাতে সহায়তা করতে পারে।
লাল রঙই কেন এত পরিচিত?
বিরিয়ানির হাঁড়িতে কাপড় ব্যবহারের কারণ বোঝা গেলেও প্রশ্ন থেকে যায়, কাপড়টি লালই কেন?
এর একটি সহজ ব্যাখ্যা হতে পারে দৃশ্যমানতা। খাবারের দোকানে নানা ধরনের পাত্র ও উপকরণের মধ্যে উজ্জ্বল লাল কাপড়ে মোড়ানো বড় হাঁড়ি সহজেই চোখে পড়ে। দূর থেকেই ক্রেতারা বুঝতে পারেন, সেখানে বিরিয়ানি বিক্রি হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দোকানে একই ধরনের দৃশ্য দেখতে দেখতে লাল কাপড়ে মোড়ানো হাঁড়ি বিরিয়ানির সঙ্গে মানুষের মনে এক ধরনের পরিচিত সম্পর্ক তৈরি করেছে। ফলে কাপড়টি এখন শুধু হাঁড়ি ঢেকে রাখার উপকরণ নয়, বরং বিরিয়ানির একটি পরিচিত দৃশ্যমান প্রতীকও।
তবে লাল রঙ বেছে নেওয়ার পেছনে ঐতিহাসিক কারণই প্রধান ছিল, নাকি ধীরে ধীরে দোকানদারদের ব্যবহারের মাধ্যমে এটি জনপ্রিয় হয়েছে—তার নির্দিষ্ট উত্তর নিশ্চিতভাবে জানা যায় না।
একটি কাপড়, বিরিয়ানির পরিচিত প্রতীক
বিরিয়ানির হাঁড়িতে লাল কাপড় মোড়ানোর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এর সঙ্গে মুঘল ও নবাবি সংস্কৃতির যোগসূত্র নিয়ে প্রচলিত ধারণা রয়েছে, আবার হাঁড়ির তাপ ধরে রাখা এবং দোকানে সহজে নজর কাড়ার মতো ব্যবহারিক দিকও আছে।
সময়ের সঙ্গে এই রীতি এতটাই পরিচিত হয়ে উঠেছে যে লাল কাপড়ে মোড়ানো হাঁড়ি দেখলেই অনেকের মনে বিরিয়ানির কথা আসে। তাই এর উৎপত্তির ইতিহাস পুরোপুরি নিশ্চিত না হলেও, লাল কাপড় যে বিরিয়ানির দৃশ্যমান পরিচয়ের অংশ হয়ে গেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
একটি সাধারণ কাপড় কীভাবে একটি জনপ্রিয় খাবারের সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যেতে পারে, বিরিয়ানির লাল হাঁড়ি তারই পরিচিত উদাহরণ।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!