ভবেরপাড়ার নারীদের হস্তশিল্পে ইউরোপজুড়ে চাহিদা
মেধা, পরিশ্রম ও দৃঢ় মনোবল থাকলে নারীরাও যে সংসার ও সমাজ বদলে দিতে পারেন, তার উজ্জ্বল উদাহরণ মেহেরপুরের ভবেরপাড়া গ্রামের নারী উদ্যোক্তারা। সংসারের সব কাজ সামলে পাট দিয়ে তৈরি হস্তশিল্পের মাধ্যমে শুধু নিজেদের ভাগ্যই বদলাননি, বদলে দিচ্ছেন গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্রও।
মুজিবনগর উপজেলার বাগওয়ান ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এই গ্রামে অনেক নারীই বিধবা, কেউ অতিদরিদ্র, আবার কারও পরিবারে নেই উপার্জনক্ষম মানুষ। কিন্তু সেই নারীরাই এখন পাট দিয়ে তৈরি মাদুর, টেবিল ম্যাট, ব্যাগ, ফুলদানি, দোলনা, খেলনা মাছ, ক্রিসমাসের তারকা—এমন নানা পণ্য তৈরি করে নিজেদের স্বাবলম্বী করে তুলেছেন।
খুলনাভিত্তিক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান **বেইজ** এসব পণ্য সংগ্রহ করে ইউরোপের স্পেন, ইতালি, জার্মানি, সুইডেন, ফিনল্যান্ডসহ আমেরিকার বাজারে রপ্তানি করছে। পাটপণ্যের দাম ১০০ টাকা থেকে শুরু করে ১৪–১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।
### ঘরে বসেই বদলে গেছে জীবনের গল্প
১৭ নভেম্বর ভবেরপাড়া চার্চসংলগ্ন একটি ভবনে গিয়ে দেখা যায়, ১৬ জন নারী একসঙ্গে বসে পাটপণ্য তৈরিতে ব্যস্ত। উদ্যোক্তা সন্ধ্যা মণ্ডল জানান, ২০১৭ সালে কণা রানী নামে এক নারী মাত্র পাঁচজনকে নিয়ে এই কাজ শুরু করেন। বর্তমানে শতাধিক নারী এই কাজে যুক্ত হয়েছেন, যা দিন দিন বাড়ছেই।
নারীরা রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের দেওয়া কাঁচামাল ও নকশা নিয়ে বাড়িতে বসে কাজ করেন। যাঁদের বাড়িতে সুযোগ নেই, তাঁরা কর্মস্থলেই পণ্য তৈরি করেন। এক কেজি পাট কিনতে খরচ হয় প্রায় ৭০ টাকা, আর তৈরি পণ্য ১৪০ টাকায় বিক্রি হয়—অর্থাৎ পাটের দামের দ্বিগুণ আয়।
### দিনে আয় ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা
অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আয়ও বেড়েছে। দিনে সময় দিতে পারলে একজন নারী প্রতিদিন ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন। সন্ধ্যা মণ্ডল জানান, স্বামী মারা যাওয়ার পর এই কাজ করেই সন্তানদের লেখাপড়া করিয়েছেন, জমি কিনে বাড়ি করেছেন। এখন সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করছেন।
### সোনালি পাটের সংকট
রপ্তানিযোগ্য পাটপণ্যের জন্য প্রয়োজন সোনালি রঙের উন্নত মানের পাট। মেহেরপুরের পাট সাধারণত কালচে হওয়ায় ফরিদপুর থেকে কাঁচামাল আনতে হয়। এতে খরচ বাড়ে। সাশ্রয়ী মূল্যে ভালো পাট পাওয়া গেলে আয় আরও বাড়ত বলে জানান উদ্যোক্তারা।
### বিদেশিদের প্রশংসায় অনুপ্রাণিত
নারী উদ্যোক্তা মালা রানী বলেন, “আমাদের হাতে তৈরি পাটপণ্য বিদেশে যাচ্ছে—এটাই বড় গর্ব। ইতালি, স্পেন ও আমেরিকা থেকে ক্রেতারা এসে কাজ দেখে গেছেন, আরও বেশি পণ্য নেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছেন।”
### প্রশাসনের সহযোগিতার আশ্বাস
রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান বেইজের পরিচালক সৌরভ আনছারী জানান, গ্রামীণ নারীদের স্বনির্ভর করাই তাদের লক্ষ্য। মুজিবনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পলাশ মণ্ডল বলেন, নারী উদ্যোক্তাদের বাজার সম্প্রসারণ ও মানসম্মত পাট উৎপাদনে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে।
জেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা নাসিমা খাতুন বলেন, “ভবেরপাড়ার নারীরা ঘরে বসেই বিশ্বমানের পাটপণ্য তৈরি করছেন—এটি আমাদের জন্য গর্বের।”
### শেষ কথা
সততা, পরিশ্রম ও সুযোগ পেলে গ্রামীণ নারীরাও বিশ্ববাজারে নিজেদের জায়গা করে নিতে পারেন। ভবেরপাড়ার নারীরা তারই অনন্য উদাহরণ—যাঁদের হাতের ছোঁয়ায় পাটপণ্য পৌঁছে যাচ্ছে ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!