Dark Mode
Image
  • Monday, 27 July 2026
মাটির বিস্কুট ‘ছিকর’ তৈরির রহস্য

মাটির বিস্কুট ‘ছিকর’ তৈরির রহস্য

হবিগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী মাটির বিস্কুট ‘ছিকর’ তৈরির অজানা ইতিহাস

একসময় ক্ষুধা নিবারণের অন্যতম ভরসা ছিল মাটি দিয়ে তৈরি বিশেষ এক ধরনের বিস্কুট—‘ছিকর’। বর্তমান প্রজন্মের অনেকের কাছেই এটি অচেনা হলেও একসময় হবিগঞ্জসহ সিলেট অঞ্চলের নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল এই ব্যতিক্রমী খাবার। সময়ের সঙ্গে জনপ্রিয়তা কমলেও দেশের কিছু এলাকায় এখনো ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে তৈরি ও খাওয়া হয় ছিকর।

কী এই ছিকর?

ছিকর মূলত বিশেষ ধরনের এঁটেল মাটি পুড়িয়ে তৈরি করা এক ধরনের ঐতিহ্যবাহী খাদ্য। ১৯৭০ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকায় এটি ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। অনেক দরিদ্র মানুষ ক্ষুধা মেটাতে ছিকর খেতেন। আবার অনেকের কাছে এটি ছিল এক ধরনের অভ্যাস বা পছন্দের খাবার।

ভাষাবিদদের মতে, ‘ছিকর’ শব্দটির উৎপত্তি ফারসি ভাষা থেকে। ‘ছিয়া’ অর্থ কালো এবং ‘কর’ অর্থ মাটি। সময়ের সঙ্গে ‘ছিয়াকর’ শব্দটি পরিবর্তিত হয়ে ‘ছিকর’ নামে পরিচিতি পায়।

যেভাবে তৈরি হয় ছিকর

ছিকর তৈরিতে সাধারণ মাটি ব্যবহার করা হয় না। এর জন্য প্রয়োজন হয় পাহাড়ি টিলার নিচের স্তরের বিশেষ ধরনের মিহি এঁটেল মাটি।

প্রথমে গভীর গর্ত খুঁড়ে সেই মাটি সংগ্রহ করা হয়। এরপর সারারাত পানিতে ভিজিয়ে রেখে মাটি নরম করা হয়। কয়েক ধাপে ভালোভাবে মেখে মসৃণ করার পর ছাঁচে ফেলে মণ্ড তৈরি করা হয়।

পরে কাঠের হাতুড়ি দিয়ে মণ্ড চ্যাপ্টা করে ছুরি দিয়ে বিস্কুটের মতো ছোট ছোট টুকরায় কাটা হয়। বাজারের চাহিদা অনুযায়ী লম্বা, গোল, ললিপপ বা লজেন্সের আকৃতিতেও ছিকর তৈরি করা হয়।

পোড়ানোর বিশেষ কৌশল

আকৃতি দেওয়ার পর কাঁচা ছিকর এক থেকে দুই দিন রোদে শুকানো হয়। এরপর বিশেষ চুলায় পোড়ানোর পালা শুরু হয়।

একটি মাটির হাঁড়ির নিচের অংশ ভেঙে সেখানে লোহার শিকের তৈরি চালুনি বসানো হয়। তার ওপর ছিকর সাজিয়ে হাঁড়িটি একটি মাটির গর্তে স্থাপন করা হয়। পরে ধানের তুষ দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে সরাসরি আগুন নয়, বরং ধোঁয়ার মাধ্যমে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে পোড়ানো হয়।

এই প্রক্রিয়ায় ছিকরের রং কালচে হয়ে যায় এবং তৈরি হয় স্বতন্ত্র সুগন্ধ, যা এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

স্বাদে ছিল ভিন্নতা

হবিগঞ্জে ছিকরের উৎপত্তি হলেও পরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এর প্রচলন ঘটে। অঞ্চলভেদে স্বাদেও ছিল পার্থক্য।

কোথাও কোথাও মাটি মাখানোর সময় গোলাপজল, আদার রসসহ বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করা হতো। পোড়ানোর পর এসব উপাদান ছিকরে ভিন্ন ধরনের সুবাস ও স্বাদ এনে দিত।

গর্ভবতী নারীদের কাছেও ছিল জনপ্রিয়

একসময় অনেক গর্ভবতী নারী বিশ্বাস করতেন, ছিকর খেলে শরীর ভালো থাকে এবং গর্ভের সন্তান সুস্থ থাকে। যদিও এ ধরনের বিশ্বাসের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বীকৃতি নেই।

হারিয়ে যাচ্ছে শত বছরের ঐতিহ্য

ইতিহাসবিদদের মতে, মৌলভীবাজারের পাহাড়ি এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের নারীরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে ছিকর বিক্রি করতেন। পাশাপাশি স্থানীয় কুমার ও মৃৎশিল্পীরাও এটি তৈরি করে বাজারজাত করতেন।

বর্তমানে চাহিদা কমে যাওয়ায় অধিকাংশ কারিগরই এই পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। তবে দেশের কিছু অঞ্চলে এখনো ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে সীমিত পরিসরে ছিকর তৈরি ও বিক্রি করা হয়। অনেক দেশীয় পণ্যের উদ্যোক্তাও অনলাইনের মাধ্যমে এই ঐতিহ্যবাহী মাটির বিস্কুট বিক্রি করছেন।

ইতিহাসের স্মারক হয়ে আছে ছিকর

একসময় মানুষের ক্ষুধা নিবারণের অন্যতম খাদ্য হলেও আধুনিক খাদ্যাভ্যাসের কারণে ছিকরের ব্যবহার অনেকটাই কমে গেছে। তবুও এটি বাংলাদেশের লোকঐতিহ্য, সংগ্রামী জীবন এবং অতীতের সামাজিক বাস্তবতার এক অনন্য স্মারক হিসেবে আজও টিকে আছে।

Comment / Reply From