সারাদিন ক্লান্ত লাগছে? কারণ হতে পারে রক্তে বাড়তি শর্করা
কাজের মাঝেই হঠাৎ শরীর অবসন্ন হয়ে পড়া, অকারণে ক্লান্ত লাগা বা দুপুরের পর থেকেই চোখে ঘুম নেমে আসা—এমন সমস্যায় ভোগেন অনেকেই। বেশিরভাগ মানুষ এর জন্য কম ঘুম, অতিরিক্ত কাজের চাপ বা মানসিক ক্লান্তিকে দায়ী করেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘক্ষণ ধরে এমন ক্লান্তি অনুভবের পেছনে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে।
স্বাস্থ্যবিষয়ক বিভিন্ন গবেষণা বলছে, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলে শরীর পর্যাপ্ত শক্তি উৎপাদন করতে পারে না। ফলে সারাদিন অবসন্নতা ও ক্লান্তি অনুভূত হয়।
ডায়াবেটিস না থাকলেও কি রক্তে শর্করা বাড়তে পারে?
অনেকেই মনে করেন, শুধু ডায়াবেটিস রোগীদেরই রক্তে শর্করা বাড়ে। বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রেও সাময়িকভাবে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। এর পেছনে কয়েকটি সাধারণ কারণ রয়েছে।
অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার
অতিরিক্ত সাদা ভাত, ময়দাজাত খাবার, মিষ্টি, কোমল পানীয় বা ফাস্টফুড খেলে রক্তে দ্রুত গ্লুকোজ বেড়ে যেতে পারে। এই অবস্থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে অ্যাকিউট হাইপারগ্লাইসেমিয়া বলা হয়।
মানসিক চাপ ও অসুস্থতা
অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ কিংবা শরীরে সংক্রমণ থাকলেও কর্টিসলসহ বিভিন্ন হরমোনের প্রভাবে রক্তে শর্করার মাত্রা সাময়িকভাবে বেড়ে যেতে পারে।
রক্তে শর্করা বাড়লে ক্লান্তি কেন আসে?
গ্লুকোজ আমাদের শরীরের প্রধান শক্তির উৎস। কিন্তু রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলেও যদি কোষগুলো সেই গ্লুকোজ ব্যবহার করতে না পারে, তাহলে শরীরে শক্তির ঘাটতি তৈরি হয়।
অর্থাৎ, শরীরে জ্বালানি থাকলেও তা কাজে লাগানো সম্ভব হয় না।
এ ছাড়া অতিরিক্ত শর্করা—
- শরীরে প্রদাহ (Inflammation) বাড়ায়
- পানিশূন্যতা তৈরি করে
- হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে
ফলে শরীর আরও বেশি অবসন্ন ও দুর্বল অনুভূত হয়।
প্রি-ডায়াবেটিসের নীরব লক্ষণ
অনেকেই না জেনেই প্রি-ডায়াবেটিসে ভুগে থাকেন। এ সময় রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকলেও সেটি এখনও পূর্ণাঙ্গ ডায়াবেটিসে পরিণত হয়নি।
যদি দীর্ঘদিন ক্লান্তির পাশাপাশি নিচের লক্ষণগুলো দেখা যায়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—
- বারবার তৃষ্ণা পাওয়া
- বিশেষ করে রাতে ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া
- চোখে ঝাপসা দেখা
- ক্ষত বা কাটা জায়গা দেরিতে শুকানো
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে করণীয়
প্রক্রিয়াজাত কার্বোহাইড্রেট কমান
সাদা ভাত, ময়দা, মিষ্টি ও কোমল পানীয় কমিয়ে লাল চাল, আটার রুটি এবং স্বাস্থ্যকর কার্বোহাইড্রেট বেছে নিন।
বেশি আঁশযুক্ত খাবার খান
সবুজ শাকসবজি, ডাল, ফলমূল ও পূর্ণ শস্যজাত খাবার রক্তে গ্লুকোজ ধীরে বাড়ায় এবং দীর্ঘ সময় শক্তি ধরে রাখতে সাহায্য করে।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন
শরীরে পানির ঘাটতি থাকলে ক্লান্তি আরও বেড়ে যেতে পারে। তাই প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি।
নিয়মিত ব্যায়াম করুন
প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা বা মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়াতে এবং রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে।
পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ
প্রতিদিন ৭–৮ ঘণ্টা ভালো ঘুম এবং ধ্যান, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম কিংবা পছন্দের কাজে সময় দেওয়া কর্টিসল নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
যদি পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার পরও দীর্ঘদিন ধরে ক্লান্তি না কমে অথবা উপরের লক্ষণগুলোর একাধিকটি দেখা যায়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফাস্টিং ব্লাড সুগার ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া উচিত।
সচেতন থাকুন
অকারণ ক্লান্তিকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। এটি শুধু অতিরিক্ত কাজের ফল নাও হতে পারে; বরং শরীরের ভেতরে রক্তে শর্করার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেতও হতে পারে। তাই সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং সময়মতো স্বাস্থ্য পরীক্ষা সুস্থ থাকার অন্যতম চাবিকাঠি।
দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদনটি সাধারণ স্বাস্থ্যসচেতনতার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। কোনো রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার বিকল্প নয়। দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা থাকলে অবশ্যই একজন নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!