Dark Mode
Image
  • Wednesday, 29 July 2026
হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ঢেঁকি ঐতিহ্য

হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ঢেঁকি ঐতিহ্য

গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি এখন ইতিহাস, হারিয়ে যাচ্ছে শত বছরের সংস্কৃতি

একসময় গ্রামবাংলার প্রতিটি জনপদে ঢেঁকির শব্দ ছিল নিত্যদিনের পরিচিত সুর। ধান ভানা, চাল তৈরি কিংবা পিঠা-পুলির আটা প্রস্তুতের প্রধান মাধ্যম ছিল কাঠের তৈরি এই ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি। পল্লিবধূদের কণ্ঠে ভেসে আসত—‘ও বউ ধান ভানে রে, ঢেঁকিতে পার দিয়া…’। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন আর প্রযুক্তির অগ্রগতিতে সেই ঢেঁকি আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে।

এক সময় শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত নওগাঁর আত্রাইসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই একটি করে ঢেঁকি থাকত। নতুন ধান ঘরে উঠলেই শুরু হতো নবান্ন উৎসব। ঢেঁকিতে ধান ভেনে চাল ও আটা তৈরি করা হতো, আর সেই আটা দিয়ে বানানো হতো ভাপা, পাটিসাপটা, চিতই, পুলি, তেলে ভাজাসহ নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী পিঠা। উৎসবের আমেজে মুখর হয়ে উঠত পুরো গ্রাম।

প্রবীণদের ভাষ্য, ঢেঁকিছাঁটা চাল ও আটা শুধু সুস্বাদুই ছিল না, বরং স্বাস্থ্যকরও ছিল। শিশুদের জন্য ঢেঁকিছাঁটা চালের জাউ তৈরি করা হতো। বিয়ে, নবান্ন কিংবা পারিবারিক নানা আয়োজনে ঢেঁকির তৈরি চাল ও আটার ব্যবহার ছিল অপরিহার্য।

তবে আশির দশক থেকে ধীরে ধীরে বদলে যেতে শুরু করে এই চিত্র। বিদ্যুৎচালিত ধান ভাঙার কল, মিনি রাইস মিল এবং আধুনিক মেশিনের প্রসারের ফলে গ্রামবাংলা থেকে হারিয়ে যেতে থাকে ঢেঁকি। বর্তমানে অনেক গ্রাম ঘুরেও একটি ঢেঁকির দেখা পাওয়া কঠিন। নতুন প্রজন্মের অনেকেই বাস্তবে ঢেঁকি দেখেনি, এমনকি এর ব্যবহার সম্পর্কেও জানে না।

ঢেঁকি মূলত বড় কাঠের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি একটি ঐতিহ্যবাহী যন্ত্র। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ছয় ফুট। এক প্রান্তে থাকে লোহার রিং লাগানো ভারী অংশ, যা ধান বা চালের ওপর আঘাত করে। অন্য প্রান্তে পা দিয়ে চাপ প্রয়োগ করলে যন্ত্রটি ওঠানামা করে। সাধারণত তিনজনের সমন্বয়ে ঢেঁকিতে ধান ভানার কাজ সম্পন্ন হতো। একজন বা দুজন পা দিয়ে চাপ দিতেন, আর একজন ধান বা চাল নেড়ে সমানভাবে ভানার কাজ করতেন।

যান্ত্রিক প্রযুক্তির কারণে ঢেঁকির ব্যবহার কমে গেলেও দেশের কিছু এলাকায় এখনো ঐতিহ্য ধরে রাখতে সীমিত পরিসরে এটি ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে পিঠা তৈরির জন্য অনেকেই এখনও ঢেঁকিতে ভাঙানো আটা পছন্দ করেন। কারণ তাদের মতে, মেশিনে তৈরি আটার তুলনায় ঢেঁকির আটার স্বাদ ও গুণগত মান অনেক ভালো।

বর্তমানে কিছু পরিবার ব্যবসায়িকভাবে ঢেঁকি ব্যবহার করে আটা তৈরি করে থাকেন। প্রতি কেজি চাল থেকে আটা তৈরি করতে নেওয়া হয় ১০ থেকে ১২ টাকা। যদিও সংখ্যায় খুবই কম, তবুও এসব উদ্যোগ গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা একটি ঐতিহ্যকে কিছুটা হলেও টিকিয়ে রেখেছে।

প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে। তবে সেই পরিবর্তনের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ সংস্কৃতির বহু মূল্যবান ঐতিহ্য। ঢেঁকি আজ শুধু একটি কৃষিযন্ত্র নয়, বরং বাংলার লোকজ ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্য তুলে ধরতে সংরক্ষণ ও সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংস্কৃতিবিষয়ক গবেষকরা।

Comment / Reply From