Dark Mode
Image
  • Wednesday, 02 September 2026

মাদকের বিরুদ্ধে মাঠে নামা এক শিক্ষক

মাদকের বিরুদ্ধে মাঠে নামা এক শিক্ষক

সীমান্ত উপজেলা টেকনাফ—একদিকে পাহাড় ও সমুদ্রের অপরূপ সৌন্দর্য, অন্যদিকে মাদকের ভয়াল বিস্তার। বেকারত্ব ও সহজ অর্থের প্রলোভনে প্রতিনিয়তই মাদকের ফাঁদে পড়ছে কিশোর-তরুণেরা। এই অন্ধকার বাস্তবতায় আলোর রেখা হয়ে দাঁড়িয়েছেন ফরহাদুজ্জামান (৪৫)—একজন শিক্ষক, যাঁর যুদ্ধক্ষেত্র ফুটবল মাঠ।

টেকনাফ পৌরসভার দক্ষিণ জালিয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা ফরহাদুজ্জামান পেশায় বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। স্থানীয়দের কাছে তিনি ‘ফরহাদ মেজ’ নামেই বেশি পরিচিত। প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি বিনা পারিশ্রমিকে ফুটবল প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কিশোর-তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

মাঠেই শৃঙ্খলার পাঠ

বুধবার বিকেলে টেকনাফ মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে দেখা যায়—কিশোর ও তরুণদের নিয়ে অনুশীলনে ব্যস্ত ফরহাদ। খেলাধুলার পাশাপাশি তিনি শেখান শৃঙ্খলা, দলগত কাজ ও সময়ানুবর্তিতা। অভিভাবক হারুন সিকদার বলেন, ‘টেকনাফে মাদক সহজলভ্য। সন্তানদের নিয়ে আমরা সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকি। ফরহাদ স্যার ছেলেদের মাঠে রেখে মাদক থেকে দূরে রাখছেন—এই বিশ্বাস থেকেই ছেলেকে এখানে এনেছি।’

একটাই শর্ত—মাদক নয়

স্কুল শেষে বিশ্রাম নয়, বিকেলেও মাঠে ছুটে যান ফরহাদ। প্রশিক্ষণের জন্য কোনো পারিশ্রমিক নেন না। অনেক সময় নিজের টাকায় ফুটবল, জার্সি ও অনুশীলনের সরঞ্জাম কিনে দেন। বিনিময়ে তাঁর একটাই শর্ত—মাদক থেকে দূরে থাকা।
ফরহাদুজ্জামান বলেন, ‘এলাকার ছেলেরা খারাপ নয়, সুযোগ কম আর ভুল পথের হাতছানি বেশি। খেলাধুলা মানুষকে বদলে দিতে পারে—একটা জীবন যদি ঠিক পথে আসে, সেটাই আমার প্রাপ্তি।’

নিজের খরচেই একাডেমি

মাদকপ্রবণ এলাকা বিবেচনায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘টেকনাফ ক্রীড়াঙ্গন ফুটবল একাডেমি’। বর্তমানে শতাধিক কিশোর-তরুণ এখানে নিয়মিত অনুশীলন করছে। বছরে জেলা পর্যায় থেকে কোচ এনে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে বছরে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা খরচ হলেও সরকারি সহায়তা প্রায় নেই; অনেক সময় নিজের পকেট থেকেই ৫০–৬০ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়।

ছাত্রজীবন থেকেই ফরহাদ উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের খেলোয়াড় ছিলেন। চট্টগ্রাম পাইওনিয়ার ফুটবল লিগ ও কক্সবাজার অলিম্পিক স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগেও খেলেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘মাদকপ্রবণ এলাকায় তরুণদের বাঁচাতে খেলাধুলার বিকল্প নেই। সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা পেলে আরও অনেককে রক্ষা করা সম্ভব।’

বদলে যাওয়া জীবনের গল্প

২০২৩–২৪ মৌসুমে ফরহাদের একাডেমির খেলোয়াড় আরফাত, প্রমিথ ও রায়হান প্রাথমিক পর্যায়ে খেলে দলকে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন করেছে। তরুণ ফুটবলার জাহেদুল ইসলাম বলেন, ‘আগে অযথা সময় নষ্ট করতাম। এখন খেলাই আমাদের নেশা।’ জেলা পর্যায়ের খেলোয়াড় শামসুল হুদা যোগ করেন, ‘ফরহাদ স্যার না থাকলে হয়তো আমরা অনেকেই নষ্ট হয়ে যেতাম।’

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমামুল হাফিজ নাদিম বলেন, ‘মাদকপ্রবণ এলাকায় খেলাধুলা বাড়ানো জরুরি। যুবসমাজকে রক্ষা করতে সমাজের সব স্তরের মানুষের এগিয়ে আসা প্রয়োজন।’

Comment / Reply From