Dark Mode
Image
  • Thursday, 29 January 2026

অবহেলা ও আধুনিকতার চাপে বিলুপ্তির পথে আশাশুনির ঐতিহ্যবাহী মেলে মাদুর শিল্প

অবহেলা ও আধুনিকতার চাপে বিলুপ্তির পথে আশাশুনির ঐতিহ্যবাহী মেলে মাদুর শিল্প

এক সময় সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার মাদুর দেশের গণ্ডি পেরিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ছিল সুপরিচিত। বিশেষ করে মেলে ঘাস দিয়ে হাতে বোনা মাদুর ছিল গ্রামবাংলার জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন, আধুনিকতার আগ্রাসন ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সেই ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির মুখে।

দুই দশক আগেও আশাশুনির তেঁতুলিয়া গ্রামের প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবার মাদুর তৈরি ও বিক্রির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করত। অথচ বর্তমানে সেখানে হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার মাত্র এ পেশার সঙ্গে যুক্ত। কাঁচামালের সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় অনেক কারিগর ইতোমধ্যে পেশা বদল করতে বাধ্য হয়েছেন।

হারিয়ে যাচ্ছে পরিচিত বাজার

আশাশুনির কাঁদাকাটি, বড়দল, খাজরা, প্রতাপনগরসহ বিভিন্ন এলাকায় এক সময় ব্যাপকভাবে মাদুর তৈরি হতো। বড়দল ও বুধহাটা বাজার ছিল মাদুর হাট হিসেবে পরিচিত। প্রতি সপ্তাহে এসব হাটে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে কারিগররা তাদের তৈরি মাদুর বিক্রি করতেন। সেখান থেকে মাদুর সরবরাহ হতো খুলনা, যশোরসহ আশপাশের জেলাগুলোতে।
কিন্তু বর্তমানে বাজারে মাদুরের চাহিদা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।

 কাঁচামাল সংকট ও লাভের অভাব

মাদুর তৈরির প্রধান উপকরণ ‘মেলে ঘাস’ এক সময় এ অঞ্চলে প্রচুর চাষ হতো। তবে চাহিদা কমে যাওয়ায় কৃষকরাও মেলে চাষে আগ্রহ হারিয়েছেন। অনেক জমিতে এখন মাছের ঘের গড়ে উঠেছে।
বর্তমানে একটি ছোট মাদুর তৈরি করতে খরচ পড়ে ২৫০–৩০০ টাকা, যা বিক্রি হয় সর্বোচ্চ ৩৫০ টাকায়। বড় মাদুরে খরচ পড়ে ৪৫০–৫০০ টাকা, বিক্রি হয় ৬০০ টাকায়। এতে লাভের পরিমাণ খুবই সীমিত।

বিলুপ্তির পেছনের কারণ

মাদুর শিল্প ধ্বংসের পেছনে রয়েছে—

* প্রধান কাঁচামাল মেলে ঘাসের দুষ্প্রাপ্যতা
* প্লাস্টিকের মাদুরের আধিক্য ও কম দাম
* উৎপাদন খরচের তুলনায় কম বিক্রয়মূল্য
* সরকারি সহায়তা ও প্রণোদনার অভাব
* কপোতাক্ষ নদ শুকিয়ে যাওয়ায় পরিবেশগত সংকট

এসব কারণে এক সময়ের ব্যস্ত মাদুর কারিগররা আজ অন্য পেশায় ঝুঁকছেন। যারা এখনও এ শিল্পে যুক্ত, তারা মূলত পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখার তাগিদেই টিকে আছেন।

ঐতিহ্য ও ব্যবহার

প্রাকৃতিক ঘাস দিয়ে তৈরি হওয়ায় মেলে মাদুর ছিল শীতল, আরামদায়ক ও টেকসই। অতিথি আপ্যায়ন, নামাজ আদায়, ঘরে বসা, এমনকি শিশুদের গল্প শোনার আসর—সব ক্ষেত্রেই মাদুরের ব্যবহার ছিল ব্যাপক। একটি মাদুর অনায়াসেই ২০ বছরের বেশি সময় ব্যবহার করা যেত।

ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

এক সময় আশাশুনিতে ২৫০–৩০০ পরিবার মাদুর শিল্পের ওপর নির্ভরশীল থাকলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০০ পরিবারে। শিল্পটি টিকিয়ে রাখতে হলে অবিলম্বে সহজ শর্তে ঋণ, কাঁচামাল সহায়তা ও সরকারি প্রণোদনার ব্যবস্থা জরুরি। অন্যথায় আগামী এক দশকের মধ্যেই আশাশুনির মেলে মাদুর কেবল স্মৃতিতেই রয়ে যাবে।

Comment / Reply From