Dark Mode
Image
  • Wednesday, 04 February 2026
উন্নয়নের আড়ালে বাল্যবিয়ে ও শিশু শ্রম: বাংলাদেশের নীরব সংকট

উন্নয়নের আড়ালে বাল্যবিয়ে ও শিশু শ্রম: বাংলাদেশের নীরব সংকট

আন্তর্জাতিক শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক বাস্তবতা—এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ এখনো বাল্যবিয়ের শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। আয়তনে ক্ষুদ্র হলেও জনসংখ্যা ও সামাজিক বাস্তবতায় এই সংকটের গভীরতা বিস্তৃত। নারী শিক্ষায় কিছু অগ্রগতি দৃশ্যমান হলেও সেই অর্জনের আড়ালেই রয়ে যাচ্ছে ভয়াবহ বৈষম্য ও অব্যবস্থাপনা।

গত শতাব্দীর শেষ দশক থেকে একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে বাংলাদেশের নারীরা শিক্ষায় এগিয়েছে, যুক্ত হয়েছে বৈচিত্র্যময় পেশায়। এই অগ্রযাত্রা নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক। তবে সংখ্যাগত ঘাটতি এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে সুযোগের অসম বণ্টনের কারণে এই ইতিবাচক চিত্র সার্বিক উন্নয়নে যথাযথ প্রতিফলন ঘটাতে পারছে না। সমসংখ্যকের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি যে অধরাই থেকে যায়, তা এখন স্পষ্ট।

বাংলাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল গ্রামপ্রধান হওয়ায় কন্যা শিশুর বিদ্যালয়গমন এখনো পুরোপুরি নির্বিঘ্ন নয়। দারিদ্র্য, সামাজিক রক্ষণশীলতা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক ছাত্রী মাঝপথেই ঝরে পড়ে। যদিও সামগ্রিকভাবে গ্রামাঞ্চলে শিশু শিক্ষার হার বেড়েছে, তবু ঝরে পড়ার হার উদ্বেগজনক। শুধু কন্যা শিশুই নয়, দারিদ্র্যের কষাঘাতে পুত্র শিশুরাও শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

এরই পাশাপাশি উন্নয়ন অবকাঠামো গড়তে ব্যবহৃত হচ্ছে অমানবিক শিশু শ্রম। যাদের হাতে বই থাকার কথা, তারা কেউ বিয়ের পিঁড়িতে বসছে কনের সাজে, কেউবা ইট-বালি-সিমেন্টের ভার বহন করছে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে। ফলে বাল্যবিয়ে ও শিশু শ্রম আলাদা কোনো সংকট নয়; বরং দুটিই দারিদ্র্য ও বৈষম্যের একটি নির্মম বাস্তবতার অংশ।

নগরায়নের ঝলমলে দালানকোঠা ও শিল্পকারখানার আধুনিকতার আড়ালে বেড়ে উঠছে বস্তিবাসীর দুর্বিষহ জীবন। এই বৈপরীত্য যেন নিউটনের গতির তৃতীয় সূত্রের বাস্তব প্রতিফলন—প্রত্যেক ক্রিয়ারই রয়েছে সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া। উন্নয়ন হচ্ছে, কিন্তু তার মূল্য দিচ্ছে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল অংশ—নারী ও শিশু।

স্বৈরাচার পতনের পর বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী আন্দোলন নতুন আশার সঞ্চার করলেও কাঠামোগত অসংগতি ও সামাজিক অপসংস্কার এখনো গভীরভাবে প্রোথিত। সমাজবিজ্ঞানী অগবানের তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রযুক্তি ও যন্ত্র মানুষের জীবনে দ্রুত প্রবেশ করলেও চিন্তা-চেতনা ও মানসিকতা সেই গতিতে এগোয় না। ফলে বিজ্ঞান ও সামাজিক চেতনার মধ্যে তৈরি হয় এক গভীর ফারাক, যা সমাজে পশ্চাদপদতার জন্ম দেয়।

এই প্রেক্ষাপটে বাল্যবিয়ে, শিশু শ্রম ও শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার মতো সমস্যাগুলোর সমাধান সহজ নয়—বিশেষত রক্ষণশীল সমাজে। তথ্য-উপাত্ত আরও শিহরিত করে: অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যা শিশুর গর্ভে আরেক শিশুর ভ্রূণ গড়ে ওঠার ঘটনা আজও ঘটছে।

এই চিরায়ত সামাজিক সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো সর্বজনীন শিশু শিক্ষা—কন্যা ও পুত্র উভয়ের জন্য। আর সেই শিক্ষা শুরু হতে হবে পরিবার থেকেই। নতুন বাংলাদেশ গঠনের পথে এই বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকারে না আনলে বৈষম্য ও দুর্ভোগের চক্র ভাঙা সম্ভব নয়। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পর সামনে আসা ফারাকগুলো আমাদের সেই কঠিন বাস্তবতার দিকেই বারবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।

Comment / Reply From

You May Also Like