মৃৎশিল্প: বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্য, আধুনিক জীবনে নতুন করে ফিরে দেখার আহ্বান
বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি ও গ্রামবাংলার ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে মৃৎশিল্প। এটি কেবল একটি শিল্প নয়, বরং আবহমান বাংলার জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস ও নান্দনিকতার প্রতিচ্ছবি। মাটির নান্দনিক কারুকাজ ও বাহারি নকশার কারণে একসময় মৃৎশিল্পের চাহিদা ছিল ব্যাপক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অনেক পরিবার বংশগতভাবে এই শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছে।
মৃৎশিল্পীরা তৈরি করে আসছেন নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা জিনিস—হাঁড়ি-পাতিল, সরা, সুরাই, মটকা, পেয়ালা, পিঠা তৈরির ছাঁচসহ অসংখ্য সামগ্রী। বিশেষ ধরনের এঁটেল মাটি বা কাদামাটি, কখনো চীনামাটি ব্যবহার করে এসব জিনিস তৈরি করা হয় এবং পরে উচ্চ তাপে পোড়ানো হয়, যাতে সেগুলো টেকসই ও মজবুত হয়। এই শিল্পের কারিগরদের বলা হয় কুম্ভকার বা চলিত ভাষায় কুমার, আর তাঁদের কর্মস্থল পরিচিত কুমারশালা নামে।
সভ্যতার বিকাশের শুরু থেকেই মৃৎশিল্পের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। আজ থেকে দুই-তিন দশক আগেও ঢাকা জেলার ধামরাই ও সাভারের কয়েকটি গ্রাম ছিল মৃৎশিল্পের প্রাণকেন্দ্র। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্লাস্টিক ও আধুনিক পণ্যের সহজলভ্যতায় এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আজ বিলুপ্তির পথে।
আধুনিক ঘরে মৃৎশিল্পের ব্যবহার
বর্তমানে রুচিশীল মানুষেরা ঘর সাজাতে নতুন করে মাটির তৈরি সামগ্রীর দিকে ঝুঁকছেন। ছোট মোমদানি, কলমদানি, ফুল বা মাছের শো-পিস সহজেই পড়ার টেবিল বা শোকেসে মানিয়ে যায়। বড় আকারের হাতি, ঘোড়া, পাখি বা বাঘের মূর্তিও ড্রয়িং রুমের সৌন্দর্য বাড়াতে পারে।
খাবার টেবিলেও মৃৎশিল্পের ব্যবহার বাড়ছে। মাটির থালা, মগ, গ্লাস, লবণদানি কিংবা ফুলদানিতে তাজা ফুল রাখলে খাবার টেবিল পায় ভিন্ন মাত্রা। পহেলা বৈশাখ, ঈদ বা পূজা-পার্বণে মাটির হাঁড়িতে পরিবেশিত ভাত বা পোলাও অতিথি আপ্যায়নে যোগ করে ঐতিহ্যের ছোঁয়া।
দেয়ালের সাজে পোড়ামাটির ছোঁয়া
ঘরের দেয়াল সাজাতে ব্যবহার করা যেতে পারে টেরাকোটা বা পোড়ামাটির ফলক। গ্রামীণ জীবন, পশুপাখি কিংবা লোকজ আচার ফুটে ওঠা এসব ফলক দেয় ঘরে এক অনন্য নান্দনিকতা। দামি পেইন্ট বা সিরামিক টাইলসের তুলনায় এগুলো তুলনামূলক সাশ্রয়ীও বটে।
মাটির পাত্রে রান্নার উপকারিতা
মাটির পাত্রে রান্না করা খাবার শুধু সুস্বাদুই নয়, স্বাস্থ্যসম্মতও। এতে তেল কম লাগে, খাবারের স্বাদ ও গন্ধ অটুট থাকে। মাটির পাত্রে রান্না করা খাবারে লৌহ, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়ামসহ প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান বজায় থাকে, যা হজমে সহায়ক। এছাড়া মাটির হাঁড়ি তাপ ধরে রাখে, ফলে খাবার দীর্ঘ সময় ভালো থাকে। মাটির কলসির পানি স্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা ও অক্সিজেনসমৃদ্ধ হয়।
কোথায় পাওয়া যাবে মৃৎশিল্পের সামগ্রী
ঢাকায় আড়ং, যাত্রা, বেস্ট বাই, আজিজ সুপার মার্কেট, দোয়েল চত্বর, কলাবাগান, রায়েরবাজার, পালপাড়া, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় মাটির তৈরি সামগ্রী পাওয়া যায়। বর্তমানে অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও এসব পণ্যের বিক্রি বাড়ছে।
সংরক্ষণে প্রয়োজন পৃষ্ঠপোষকতা
অত্যন্ত ভঙ্গুর হওয়ায় মাটির জিনিসপত্র ব্যবহারে বাড়তি যত্ন প্রয়োজন। শুষ্ক স্থানে রাখা ও সরাসরি সূর্যালোক এড়িয়ে চললে এগুলো দীর্ঘদিন ভালো থাকে। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও সামাজিক সচেতনতা। নইলে লোকশিল্প বা তামা-কাঁসা শিল্পের মতো মৃৎশিল্পও একদিন হারিয়ে যেতে পারে।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!