ঢাকার কাছেই শতাব্দীপ্রাচীন পৌষসংক্রান্তির মেলা
বাংলার লোকজ সংস্কৃতিতে পৌষ মাস মানেই উৎসব, প্রাচুর্য আর আবেগ। কবি রবীন্দ্রনাথের আহ্বান থেকে শুরু করে লোককথার প্রবাদ—সবখানেই পৌষের উপস্থিতি গভীর। বাংলাদেশকে বলা হয় বারো মাসে তেরো পার্বণের দেশ, তবে ‘পৌষ পার্বণ’ যেন সেই পার্বণের মধ্যেও আলাদা এক ব্যঞ্জনা বহন করে। এর সঙ্গে যুক্ত পৌষসংক্রান্তি, যা অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন রূপে উদ্যাপিত হয়।
ঠিক তেমনই এক অনন্য উদ্যাপনের সাক্ষী হয়ে আছে মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার পারিল গ্রাম। ঢাকার কাছেই অবস্থিত এই গ্রামটিতে প্রতিবছর বসে শতাব্দীপ্রাচীন পৌষসংক্রান্তির মেলা, যার শিকড় ছড়িয়ে আছে ইতিহাস, লোকবিশ্বাস ও ধর্মীয় সম্প্রীতির গভীরে।
১৪ জানুয়ারির সকালে এই গ্রামে পৌঁছালেই চোখে পড়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য আর ইতিহাসের ছোঁয়া। পারিল গ্রাম শুধু মেলার জন্যই নয়, বরং নানা ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক নিদর্শনের জন্যও পরিচিত। এখানেই অবস্থিত কিংবদন্তি আলোকচিত্রী নওয়াজেশ আহমদ ও তাঁর ভাই নাইব উদ্দিনের পৈতৃক নিবাস—ঐতিহাসিক জহির মঞ্জিল। গ্রাম থেকে কিছু দূরেই রয়েছে একাদশ শতাব্দীতে আগত সুফি সাধক হজরত শাহ মুহাম্মদ ইকরামুল হক বোগদাদীর মাজার।
গ্রামটিতে আরও আছে ভাষাশহীদ রফিক উদ্দিন আহমেদ স্মৃতি জাদুঘর ও পাঠাগার। জহির মঞ্জিলে সংরক্ষিত রয়েছে ১৯০৫ সালে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ব্যবহৃত একটি টেবিল, যা ঋণসালিসি বোর্ডের প্রথম সভার স্মারক হিসেবে ইতিহাস বহন করছে।
পারিলের পৌষসংক্রান্তির মেলার কেন্দ্রবিন্দু একটি প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো বটগাছ। কিংবদন্তি আলোকচিত্রী নওয়াজেশ আহমদ এই বটগাছের নাম দিয়েছিলেন ‘মহাঅশ্বত্থ’। এই গাছের নিচেই বসে মেলার মূল আসর। স্থানীয়দের ভাষায়, এই মেলার বয়স শত শত বছরের, এমনকি লোককথায় এর শুরু সত্যযুগ পর্যন্ত গড়ায়।
এই মেলার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো মাটির ঘোড়া। পৌষসংক্রান্তির দিনে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এসে এসব মাটির ঘোড়া কিনে মহাঅশ্বত্থের নিচে সারিবদ্ধভাবে রেখে যায়। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ বিশ্বাস করে, এটি মানত পূরণের প্রতীক। পুরোনো ঘোড়াগুলো বছর শেষে সরিয়ে নতুন ঘোড়া বসানো হয়। স্থানীয়দের কাছে ঘোড়া শৌর্য ও শক্তির প্রতীক।
মেলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা লোকাচার ও কৃত্যানুষ্ঠান। পাগলা ঠাকুরের মেলা, গজার মাছ নিয়ে যজ্ঞ, শিবের কাদামাটির অবয়ব নির্মাণ—সব মিলিয়ে এখানে ধর্মীয় সম্প্রীতির এক বিরল চিত্র দেখা যায়। সন্ধ্যার দিকে প্রসাদ হিসেবে পরিবেশন করা হয় ঢ্যাপের মোয়া, যা শাপলাফুলের বীজের খই দিয়ে তৈরি—এই অঞ্চলের এক বিশেষ ঐতিহ্যবাহী খাবার।
মেলায় পাওয়া যায় কাঠ, বাঁশ ও বেতের তৈরি আসবাব, শিশুদের খেলনা, মোয়া-মুড়কি, বাতাসা, পিঠা-পুলি, আলতা ও গৃহস্থালির নানান সামগ্রী। খাবার তৈরিতে খাঁটি তেল ব্যবহারের বিষয়টি স্থানীয়রা ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবেই বিবেচনা করে।
পৌষের শেষে যখন গ্রামজুড়ে শর্ষেফুলের গন্ধ আর পাখির ডাক ছড়িয়ে পড়ে, তখন বোঝা যায়—এই মেলা শুধু কেনাবেচার নয়, এটি গ্রামীণ জীবনের স্মৃতি, বিশ্বাস আর সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!