Dark Mode
Image
  • Monday, 16 March 2026

হাজারী গুড়: মানিকগঞ্জের চারশ বছরের ঐতিহ্য ও স্বাদের ইতিহাস

হাজারী গুড়: মানিকগঞ্জের চারশ বছরের ঐতিহ্য ও স্বাদের ইতিহাস

হাজারী গুড়: মানিকগঞ্জের চারশ বছরের ঐতিহ্য ও স্বাদের ইতিহাস

মানিকগঞ্জের নাম উচ্চারণ করলেই যে ঐতিহ্যবাহী স্বাদের কথা সবার আগে মনে পড়ে, তা হলো হাজারী গুড়। লোভনীয় স্বাদ, মনকাড়া সুগন্ধ আর শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাসে ভর করে এই গুড় শুধু একটি খাদ্যপণ্য নয়—এটি মানিকগঞ্জের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ।

একসময় ‘জান্নাতাবাদ’ খ্যাত এই অঞ্চলের সুনাম আটলান্টিকের ওপারেও ছড়িয়ে পড়েছিল। জনশ্রুতি রয়েছে, প্রায় চারশ বছর আগে মানিকগঞ্জ অঞ্চলের খেজুরের পাটালি গুড়ের স্বাদ ও ঘ্রাণে মুগ্ধ হয়েছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রানী এলিজাবেথ। সেই সময় থেকেই ধীরে ধীরে হাজারী গুড়ের নাম ছড়িয়ে পড়ে দেশ-বিদেশে।

নামের পেছনের গল্প

‘হাজারী গুড়’ নামকরণের পেছনে রয়েছে নানা উপকথা। এক মতে, একসময় এই গুড় তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কয়েকটি হাজারী পরিবার—সেখান থেকেই নামটি এসেছে। আবার আরেকটি বহুল প্রচলিত কাহিনিতে বলা হয়, প্রায় দেড়শ বছর আগে ঝিটকা অঞ্চলে হাজারী প্রামাণিক নামে এক গাছি ছিলেন।

লোককথা অনুযায়ী, একদিন এক দরবেশ তার কাছে খেজুরের রস পান করতে চাইলে অলৌকিকভাবে হাঁড়ি ভর্তি রস পাওয়া যায়। দরবেশ তখন আশীর্বাদ করেন—এই গাছির তৈরি গুড়ের সুনাম দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়বে। এরপর থেকেই তার নামানুসারে এই গুড় পরিচিত হয় ‘হাজারী গুড়’ নামে।

হাজারী গুড় তৈরির প্রক্রিয়া

হাজারী গুড়ের মূল উপাদান খেজুরের রস। শীতকাল—বিশেষত ১৫ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা—এই গুড় তৈরির জন্য সবচেয়ে উপযোগী সময়।

গাছিরা বিকেলে খেজুর গাছে হাঁড়ি বসান, ভোরে রস সংগ্রহ করেন। এরপর রস ছেঁকে পরিষ্কার করে মাটির জালা বা টিনের তাফালে জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করা হয়। জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয় কাশের নাড়া। শত বছর ধরে এই প্রক্রিয়ায় তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি।

জীবন ও জীবিকার অংশ

মানিকগঞ্জের হরিরামপুরসহ ঝিটকা এলাকায় বাড়ি-আঙিনা, রাস্তার ধারে সারি সারি খেজুর গাছ আজও হাজারী গুড়ের সাক্ষ্য বহন করছে। ভোরের আজানের আগেই গাছিরা রস সংগ্রহে বেরিয়ে পড়েন, আর গৃহিণীরা চুলার পাশে গুড় জালানোর প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন।

এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত আছেন গাছি, কুমার, কামার, জ্বালানি ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, আড়তদারসহ নানা পেশার মানুষ। বর্তমানে ঝিটকায় ভালো মানের হাজারী গুড়ের দাম প্রতি কেজি এক হাজার থেকে বারোশ টাকা পর্যন্ত।

চাহিদা ও সংকট

নবাব সিরাজউদ্দৌলার আমল থেকেই ঝিটকার হাজারী ও পাটালি গুড়ের সুনাম রয়েছে। একসময় দেশের গণ্ডি পেরিয়ে অন্তত ২০টি দেশে এই গুড়ের চাহিদা ছিল। অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদনের মাস খানেক আগেই অর্ডার চলে আসত।

তবে বর্তমানে খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়া, জ্বালানির সংকট ও নকল গুড়ের দৌরাত্ম্যে এই ঐতিহ্য হুমকির মুখে। অসাধু ব্যবসায়ীরা নকল গুড়ে আসল হাজারী গুড়ের সিল লাগিয়ে বাজারজাত করায় ভোক্তারা বিভ্রান্ত হচ্ছেন।

ঐতিহ্য রক্ষায় উদ্যোগ

হাজারী গুড়ের ঐতিহ্য রক্ষায় জেলা প্রশাসন ‘লোকসংগীত ও হাজারী গুড়—মানিকগঞ্জের প্রাণের সুর’ শ্লোগানকে জেলার ব্র্যান্ডিং হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। খেজুরের বীজ বপন কর্মসূচি গ্রহণের পাশাপাশি আয়োজন করা হয়েছে ২৭ দিনব্যাপী লোকসংগীত ও হাজারী গুড় মেলা।

চারশ বছরের ইতিহাস, লোককথা আর মানুষের শ্রমে গড়ে ওঠা হাজারী গুড় আজও মানিকগঞ্জের গর্ব। প্রয়োজন শুধু সঠিক উদ্যোগ ও সংরক্ষণ—তাহলেই আবার ফিরতে পারে তার হারানো বিশ্বখ্যাত সুনাম।

Comment / Reply From