বীর প্রতীকের অবিশ্বাস্য সাহস: মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল হক মুন্সীর অগ্নিঝরা দিনগুলো
কল্পকাহিনি মনে হলেও ঘটনাগুলো নির্মম সত্য। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এমন কিছু সাহসী মানুষের নাম লেখা আছে, যাদের বীরত্ব আজও শিহরণ জাগায়। তাঁদেরই একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল হক মুন্সী (বীর প্রতীক – বার)।
জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ উপজেলার বাট্রাজোড় গ্রামের এক কৃষক পরিবারের সন্তান জহুরুল হক মুন্সী। বর্তমানে তিনি শেরপুর জেলার শ্রীবরদী উপজেলার পৌর শহরের পশ্চিম বাজার মহল্লার বাসিন্দা। বয়সের ভারে ক্লান্ত হলেও একাত্তরের স্মৃতিচারণ করতে গেলে আজও তাঁর চোখে-মুখে জ্বলে ওঠে সেই অগ্নিঝরা দিনের দীপ্তি।
একাত্তরের রণাঙ্গনে এক সাহসী তরুণ
১৯৭১ সালে বয়স ছিল মাত্র ২৬। দেশমাতৃকার টানে তিনি যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। ১১ নম্বর সেক্টরে গোয়েন্দা গেরিলা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জহুরুল হক মুন্সী। নারায়ণগঞ্জ, গাইবান্দা, জামালপুর ও কামালপুর—এই সব এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে তিনি একাধিকবার সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন।
ছদ্মবেশে মৃত্যুর মুখোমুখি
শত্রুর তথ্য সংগ্রহ করতে তিনি কখনো পান-বিড়ি-সিগারেট বিক্রেতা, কখনো বুট পালিশওয়ালা সেজে পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্পে যাতায়াত করতেন। ধরা পড়লে যে কোনো মুহূর্তে নিশ্চিত মৃত্যু—এই ঝুঁকি নিয়েই তিনি কাজ চালিয়ে গেছেন।
একবার গাইবান্দা ট্রেজারিতে এক ঝুড়ি কলা নিয়ে যান, যেখানে ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্প। কলার দাম না দিয়েই তাঁকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে জানা যায়, সেই কলা খেয়ে কয়েকজন হানাদার সৈন্য বিষক্রিয়ায় মারা যায়—যুদ্ধের ইতিহাসে এক ভয়ংকর কৌশলের উদাহরণ।
‘জয় বাংলা’ লিখে শত্রু শিবিরে আতঙ্ক
বুট পালিশওয়ালা সেজে জামালপুরের কৈরোড ঢালু ক্যাম্পে নিয়মিত যাতায়াতের সময় তিনি সেখানে লিখে আসেন—“জয় বাংলা”, “জয় বঙ্গবন্ধু”, “মুক্তিযোদ্ধা”। এতে ক্ষুব্ধ পাকিস্তানি বাহিনী সন্দেহের বশে রাজাকারদের শাস্তি দেয়, সৃষ্টি হয় ভীতির পরিবেশ।
সম্মুখযুদ্ধ ও আত্মসমর্পণের আহ্বান
বকশীগঞ্জ–কামালপুর সড়কে সংঘটিত একাধিক খণ্ডযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর শতাধিক সৈন্য নিহত হয়। শ্রীবরদী ও বকশীগঞ্জের মাঝামাঝি টিকরকান্দি গ্রামে নিহত হন পাকিস্তানি মেজর আইয়ুবসহ আরও কয়েকজন সৈন্য।
এক পর্যায়ে জহুরুল হক মুন্সী পাকিস্তানি ঘাঁটিতে প্রবেশ করেন আত্মসমর্পণের আহ্বানপত্র নিয়ে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁকে বেদম প্রহার করে জিপের পেছনে বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় জামালপুর পিটিআই ক্যাম্পে। ঘাঁটির কমান্ডিং অফিসার কর্নেল সুলতান খান সেই চিঠির জবাবে লেখেন—
“কলমে আপনার যে দক্ষতা রয়েছে, তার বদলে আপনার হাতে স্টেনগান দেখার আশা রাখি।”
চিঠির সঙ্গে দেওয়া হয়েছিল টাইম বোমা। অলৌকিকভাবে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যান জহুরুল।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার তাঁর অসীম সাহসিকতার স্বীকৃতি হিসেবে বীর প্রতীক (বার) খেতাবে ভূষিত করে। বর্তমানে তিনি নিজ বাড়িতে তিন ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে বসবাস করছেন। যাকে কাছেই পান, তাকেই শোনান একাত্তরের সেই রক্তঝরা, গৌরবময় দিনের গল্প।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!