ঐতিহ্যের স্বাদ পনির: কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের গর্ব
পনির একটি জনপ্রিয় দুগ্ধজাত খাদ্য, যা দুধ থেকে ছানা তৈরি করে পানি ঝরিয়ে প্রস্তুত করা হয়। দেশি পনিরের কথা উঠলেই সবার আগে যে নামটি আসে, তা হলো কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম। হাওড়ঘেরা এই অঞ্চলে উৎপাদিত পনির আজ শুধু দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়—বিশ্বজুড়ে পরিচিত একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার।
তাজা ও খাঁটি দুধ দিয়ে তৈরি হওয়ায় অষ্টগ্রামের পনির স্বাদে ও গুণে অনন্য। জনশ্রুতি অনুযায়ী, প্রায় ৩০০ বছর আগে মোঘল আমলে অষ্টগ্রামে আগত দত্ত পরিবারের হাত ধরেই এখানে পনির তৈরির সূচনা। একসময়, বিশেষ করে ১৯৬০ সালের দিকে, অষ্টগ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই পনির তৈরি হতো।
দুধ মন্থন করে তৈরি এই খাবারটি দেখতে দানাদার এবং স্বাদে নোনতা। মিষ্টান্ন না হলেও এর স্বতন্ত্র ঘ্রাণ ও স্বাদ জিভে জল এনে দেয়। দুধকে ছানায় রূপান্তর করে যেমন কাঁচাগোল্লা, ক্ষীর, সন্দেশ, বরফি বা রসগোল্লা তৈরি করা হয়, পনিরও প্রায় একই প্রক্রিয়ায় তৈরি—তবে স্বাদে এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
বর্তমান প্রজন্মের কাছে পনিরের পরিচয় আরও বৈচিত্র্যময়। এখন পনির ব্যবহার হচ্ছে পিৎজা, বার্গার, বিস্কুট, সমুচা, পরোটা ও সালাদে। ঢাকার নামীদামি হোটেল-রেস্তোরাঁ ও বেকারির পাশাপাশি পুরান ঢাকা, ধানমন্ডি, গুলশান, মোহাম্মদপুর, মিরপুর কিংবা উত্তরার অলিগলিতেও ফেরিওয়ালাদের কাছে পনির পাওয়া যায়।
যেভাবে তৈরি হয় ঐতিহ্যবাহী পনির
প্রথমে বড় পাত্রে দুধের সঙ্গে তেঁতুল মেশানো টক পানি ও স্বাভাবিক পানি যোগ করা হয়। কিছুক্ষণ পর দুধ জমাট বাঁধতে শুরু করলে হাত দিয়ে নেড়ে ছোট ছোট টুকরো করা হয়। এরপর বাঁশের টুকরিতে রেখে পানি ঝরানো হয়। পানি ঝরা শেষ হলে পনিরে ছোট ছিদ্র করে লবণ দেওয়া হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্যাকেটজাত বা সংরক্ষণ করা হয়। সাধারণত ১০ লিটার দুধ থেকে প্রায় ১ কেজি পনির পাওয়া যায়।
ঐতিহাসিকভাবে শুধু কিশোরগঞ্জ বা সিলেট নয়, একসময় ঢাকাসহ সারা দেশের নবাব ও জমিদার পরিবারে পনিরের কদর ছিল। এমনকি দিল্লির মোঘল বাদশাহ ও ব্রিটিশ রাজপরিবারের কাছেও অষ্টগ্রামের পনির ছিল বিশেষ পছন্দের।
বর্তমানে দেশি পনির ঢাকাসহ বিভিন্ন সুপারশপে বিক্রি হচ্ছে এবং বিদেশেও প্রশংসা কুড়াচ্ছে। কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে একটি প্রতিষ্ঠান পনির তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি করছে। এ ছাড়া ঠাকুরগাঁও, সিলেট, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও মানিকগঞ্জেও বাণিজ্যিকভাবে পনির উৎপাদন হচ্ছে।
পনির খাওয়ার উপকারিতা
পনির শরীরের এনার্জি ও প্রোটিনের ঘাটতি পূরণে সাহায্য করে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। এতে থাকা পটাশিয়াম হৃদ্যন্ত্রের কর্মক্ষমতা বাড়ায়, রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং ব্রেন স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়। ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ হওয়ায় এটি ব্রেস্ট ক্যান্সারসহ কিছু ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতেও সহায়ক। কাঁচা পনিরে থাকা ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড শরীরের ব্যথা উপশমে কার্যকর।
দেশি পনির শুধু একটি খাবার নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। তাই দেশীয় পণ্যের কদর বাড়াতে আমাদেরই এগিয়ে আসতে হবে—দেশি পণ্য কিনে দেশের মানুষ ও অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হবে।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!