Dark Mode
Image
  • Sunday, 26 April 2026
উল্লাপাড়া স্টেশনের বইঘর: স্মৃতি, ভালোবাসা আর হারানো সময়

উল্লাপাড়া স্টেশনের বইঘর: স্মৃতি, ভালোবাসা আর হারানো সময়

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া রেলস্টেশন—একসময় ছিল পরিচ্ছন্ন, প্রাণবন্ত আর মানুষের আনাগোনায় মুখর এক জায়গা। আশির দশকে এই স্টেশন শুধু যাতায়াতের কেন্দ্রই ছিল না, ছিল গল্প, আড্ডা আর বইয়ের এক ছোট্ট জগৎ। চার বন্ধু—বিপ্লব, হাকিম, মাসুদ আর আমি—প্রায়ই সেখানে সময় কাটাতাম। চা-শিঙাড়া আর ট্রেন দেখার ফাঁকে ফাঁকেই তৈরি হতো আমাদের ছোট্ট স্মৃতির ভাণ্ডার।

স্টেশনের সামনেই ছিল একটি ছোট্ট টংঘরের মতো দোকান—‘স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্স’। ছোট হলেও বইয়ের বৈচিত্র্যে ছিল ভরপুর। গল্প, উপন্যাস, জীবনী, পঞ্জিকা, শিশুতোষ বই—সবই পাওয়া যেত এখানে। শুধু কেনাবেচা নয়, দোকানের সামনে বসেই অনেকেই পত্রিকা পড়তেন। দোকানটির প্রাণ ছিলেন মেছের ভাই—একজন প্রাণবন্ত, বইপ্রেমী মানুষ।

একদিন তিনিই আমাদের হাতে তুলে দেন কাজী নজরুল ইসলামের “মৃত্যুক্ষুধা”। টাকা ছাড়াই বই নিয়ে পড়ার সুযোগ—এ যেন এক নতুন দুনিয়ার দরজা খুলে দেয় আমাদের সামনে। সেই বই পড়ার অভিজ্ঞতা আমাদের চিন্তাভাবনা বদলে দেয়। আমরা বুঝতে শিখি জীবনের গভীরতা, দারিদ্র্যের বাস্তবতা। আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় বইয়ের প্রতি আমাদের ভালোবাসা।

চার দশক পর ফিরে দেখা

প্রায় ৪০ বছর পর আবার আমরা সেই স্টেশনে ফিরে যাই। খুঁজে দেখি সেই ‘স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্স’। অবাক করা বিষয়—দোকানটি এখনো আছে, মেছের ভাইও আছেন। তবে সময় বদলেছে। আগের মতো আর ভিড় নেই, বই বিক্রিও প্রায় নেই বললেই চলে। অনেক দিন এমন যায়, একটি বইও বিক্রি হয় না।

তবুও মেছের ভাই প্রতিদিন দোকান খুলে বসেন। কারণ? তাঁর কাছে এই দোকান শুধুই ব্যবসা নয়, এটি তাঁর জীবনের অংশ, তাঁর আবেগ। তিনি বলেন, “বইয়ের গন্ধ আমার খুব ভালো লাগে। এই দোকান আমার সন্তানের মতো।”

পরিবারের চাপ, বিক্রি না হওয়া—সবকিছুর পরও তিনি ছাড়তে পারেন না তাঁর প্রিয় বইয়ের ঘর। স্বপ্ন দেখেন, হয়তো একদিন আবার ফিরবে সেই সোনালি সময়, বইয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ আবার জাগবে।

হারিয়ে যাওয়া পাঠাভ্যাসের গল্প

ডিজিটাল যুগে মানুষের হাতে স্মার্টফোন, সামনে অসংখ্য স্ক্রিন। কিন্তু সেই ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে বইয়ের দোকান, বইয়ের ঘ্রাণ আর পাঠের আনন্দ। উল্লাপাড়ার এই ছোট্ট দোকানটি যেন সেই হারিয়ে যাওয়া সময়ের এক নীরব সাক্ষী।

প্রশ্নটা থেকেই যায়—স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্স কি আবার ফিরে পাবে তার পুরোনো জৌলুশ? নাকি এটি শুধুই স্মৃতির পাতায় রয়ে যাবে?

Comment / Reply From