Dark Mode
Image
  • Thursday, 29 January 2026

কাঠমিস্ত্রি থেকে প্রকৌশলী: সুমনের স্বপ্নযাত্রা

কাঠমিস্ত্রি থেকে প্রকৌশলী: সুমনের স্বপ্নযাত্রা

ইসিজি মনিটরের রেখার মতোই মোহাম্মদ সুমনের জীবন—কখনো ঊর্ধ্বমুখী, কখনো নিম্নগামী। ওঠানামার মধ্য দিয়েই টিকে থাকা, এগিয়ে চলা। হঠাৎ ধসে পড়া এক সচ্ছল জীবনের ধ্বংসস্তূপ থেকেই গড়ে উঠেছে তাঁর স্বপ্নের ভিত।

নারায়ণগঞ্জের মদনগঞ্জে একসময় সুমনের বাবার ছিল বড় কাঠের ব্যবসা। মিল, আসবাব তৈরির কারখানা, নদীপথে গাছ পরিবহনের ট্রলার—সব মিলিয়ে স্বচ্ছল পরিবার। তিন সন্তানকে নিয়ে ছিল বাবার বড় স্বপ্ন। কিন্তু সুমন যখন দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র, তখনই জীবনে নেমে আসে ভয়াবহ ধাক্কা। ব্যবসার দায়িত্বে থাকা এক ব্যক্তির প্রতারণায় কোটি টাকার পুঁজি হারান বাবা। মাথার ওপর চেপে বসে ৪২ লাখ টাকার ঋণ।

পাওনাদারদের হুমকি-ধমকিতে কেটেছে সুমনের শৈশবের অনেক সকাল। একে একে বিক্রি হয় সব সম্পদ। শেষ পর্যন্ত পরিবার ফিরে যায় পিরোজপুরের গ্রামে—শূন্য হাতে। সেখানেও শেষ সম্বল ঘরটি বিক্রি করতে বাধ্য হন। খোলা জায়গায় টিনের ঘর তুলে শুরু হয় নতুন সংগ্রাম।

এই সংগ্রামে নামতে হয় শিশুসুমনকেও। বাবার হাত ধরে কাঠমিস্ত্রির কাজে যুক্ত হয় সে। কলম-খাতা ছেড়ে হাতে তুলে নেয় করাত, রান্দা আর ছেনি। সন্ধ্যায় পথের ধারে পিঠা ভেজে বিক্রি করে। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় দিনমজুরের কাজও করতে হয়েছে তাকে।

ঋণের বোঝা কমেনি সহজে। আয়ের বড় অংশ চলে যেত ধার শোধে। একসময় সংসারের দায়িত্ব নিতে হয় সুমনের মাকে। সেলাই মেশিনে পোশাক বানানো, ঢাকা থেকে কাপড় এনে বিক্রি—সবই করেছেন সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য। বাবার শারীরিক অবস্থাও ধীরে ধীরে খারাপ হতে থাকে।

সব প্রতিকূলতার মাঝেও সুমনের পড়াশোনা থামেনি। সন্ধ্যার পিঠার চুলার আলোতেই চলেছে অংক কষা। স্কুলের বেতন মওকুফের জন্য শিক্ষকদের কাছে মায়ের হাতজোড়—সেই দৃশ্য আজও সুমনের মনে দগদগে ক্ষত হয়ে আছে। অর্থের অভাবে এক শিক্ষিকার কাছে প্রাইভেট পড়া হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। তবু কিছু শিক্ষক পাশে দাঁড়িয়েছেন। এসএসসির সময় বিনা পারিশ্রমিকে পড়িয়েছেন এক শিক্ষক।

এইচএসসি শেষে সুমন ঢাকায় আসে। খালার বাসায় থেকে ভর্তির প্রস্তুতি নেয়। চাঁদপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নে সুযোগ পেলেও বাস্তবতা তাকে ঢাকাতেই আটকে রাখে—পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করার সুযোগের জন্য।

এই সময় সে জানতে পারে প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির কথা। অর্থনৈতিক সংকটকে যেন শিক্ষার পথে বাধা হতে না হয়—এই নীতিতে বিশ্ববিদ্যালয়টি সুমনকে শুধু ভর্তি সুযোগই দেয়নি, দিয়েছে অফিসে চাকরির ব্যবস্থাও। এখান থেকেই নতুন করে রঙিন হতে শুরু করে তার স্বপ্ন।

বর্তমানে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের পঞ্চম সেমিস্টার শেষ করেছেন সুমন। আর এক বছর পরই তিনি হবেন পূর্ণাঙ্গ প্রকৌশলী। একসময় যে ভেবেছিল জীবন বুঝি কাটবে চেয়ার-টেবিল বানাতে বানাতে, সে এখন স্বপ্ন দেখে ভবন আর সেতু নির্মাণের।

সুমনের কাছে প্রকৌশল শুধু পেশা নয়—এটি মুক্তির পথ। জীবন তাঁকে শিখিয়েছে, মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। আর সেই স্বপ্নের শক্তিতেই কাঠমিস্ত্রি থেকে প্রকৌশলী হয়ে ওঠার পথে তিনি আজ প্রায় শেষ প্রান্তে।

Comment / Reply From