এআই যুগে সন্তানের ছবি শেয়ার করছেন? আগে জেনে নিন এই ঝুঁকিগুলো
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সন্তানের ছবি বা ভিডিও শেয়ার করা এখন অনেক অভিভাবকের দৈনন্দিন অভ্যাস। জন্মদিন, ভ্রমণ কিংবা ছোট ছোট অর্জনের মুহূর্তগুলো অনলাইনে প্রকাশ করতে ভালোবাসেন অনেকে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিকাশের ফলে এই অভ্যাস এখন নতুন ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে বলে সতর্ক করেছে যুক্তরাজ্যের শীর্ষ সরকারি সংস্থা ও শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞরা।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (NCA) এবং ইন্টারনেট ওয়াচ ফাউন্ডেশন (IWF) জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত শিশুদের ছবি ব্যবহার করে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে ভুয়া ও আপত্তিকর কনটেন্ট তৈরির ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঝুঁকি শুধু যুক্তরাজ্যের নয়; বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব দেশের অভিভাবকদেরই এ বিষয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে এআই-নির্ভর অপব্যবহার
সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাস্তবসম্মত শিশু যৌন নিপীড়নের ৮ হাজারের বেশি এআই-তৈরি ছবি ও ভিডিও শনাক্ত করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০২৪ সালে যেখানে মাত্র ১৩টি এআই-নির্ভর শিশু নির্যাতনের ভিডিও শনাক্ত হয়েছিল, ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪৪০টিতে। প্রযুক্তির অপব্যবহার যে দ্রুত বাড়ছে, এই পরিসংখ্যান তারই ইঙ্গিত দেয়।
ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা টিম রাইট বলেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলেও প্রতিরোধমূলক সচেতনতা সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
অভিভাবকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের ছবি প্রকাশের আগে কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
প্রাইভেসি সেটিংস পর্যালোচনা করুন:
অ্যাকাউন্ট ব্যক্তিগত (Private) রাখুন এবং পোস্ট কারা দেখতে পারবে, তা নির্ধারণ করুন। প্রয়োজন হলে শুধু পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের জন্য আলাদা গ্রুপ ব্যবহার করুন।
পুরোনো পোস্ট যাচাই করুন:
আগে শেয়ার করা ছবিগুলো পরীক্ষা করে দেখুন সেখানে শিশুর মুখ, স্কুলের ইউনিফর্ম, বাসার ঠিকানা বা অন্য কোনো পরিচয় শনাক্ত করা যায় কি না। ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলে ছবি মুছে ফেলুন।
ছবি ব্যবহারের অনুমতি সম্পর্কে সচেতন থাকুন:
স্কুল, কোচিং, ক্লাব বা আত্মীয়স্বজন কোথায় এবং কীভাবে শিশুর ছবি ব্যবহার করছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
শিশুর মতামতকে গুরুত্ব দিন:
যদি বয়স উপযোগী হয়, তাহলে ছবি তোলা বা অনলাইনে প্রকাশের আগে শিশুর সম্মতি নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এতে তারা নিজেদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সম্পর্কে সচেতন হতে শেখে।
‘শেয়ারেন্টিং’ নিয়ে বাড়ছে নতুন উদ্বেগ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত সন্তানদের ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করার প্রবণতাকে বলা হয় ‘শেয়ারেন্টিং’ (Sharenting)। দীর্ঘদিন ধরেই বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে সতর্ক করে আসছেন। কারণ অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের ফলে পরিচয় চুরি, অনলাইন প্রতারণা এবং ভবিষ্যতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এখন এই ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এআই প্রযুক্তি। বর্তমানে এমন কিছু টুল সহজেই পাওয়া যাচ্ছে, যেগুলো ব্যবহার করে ছবিতে থাকা ব্যক্তির পোশাক পরিবর্তন বা সরিয়ে ভুয়া ও আপত্তিকর ছবি তৈরি করা সম্ভব। ফলে নিরীহ একটি পারিবারিক ছবিও অপব্যবহারের শিকার হতে পারে।
সচেতনতাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা
ইন্টারনেট ওয়াচ ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কেরি স্মিথ বলেন, পরিবারের সদস্য ও বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে সন্তানের ছবি ভাগাভাগি করতেই পারেন। তবে কোথায়, কার সঙ্গে এবং কীভাবে সেই ছবি শেয়ার করা হচ্ছে—সে বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই প্রযুক্তি যেমন আমাদের জীবনকে সহজ করছে, তেমনি এর অপব্যবহারও বাড়ছে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের ছবি প্রকাশের আগে সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনা করা এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করাই হতে পারে তাদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!