এক গরু থেকে ৬০, বদলে গেল ফারিয়ার জীবন
একটি গরু দিয়ে শুরু হয়েছিল পথচলা। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই ছোট উদ্যোগই আজ পরিণত হয়েছে একটি সফল খামারে। ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার নারী উদ্যোক্তা ফারিয়া আক্তার ইলা এখন এলাকায় পরিচিত এক সফল খামারি হিসেবে। তার প্রতিষ্ঠিত ‘ফাহিয়ান অ্যাগ্রো ফার্ম’-এ বর্তমানে রয়েছে ৬০টিরও বেশি গরু, যা স্থানীয়দের কাছে নারী উদ্যোক্তার সফলতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
স্বপ্ন থেকে বাস্তবতায়
২০২২ সালে একটি গরু দিয়ে খামার কার্যক্রম শুরু করেন ফারিয়া। শুরুতে ছোট পরিসরে গরু পালন করলেও ধীরে ধীরে বড় খামার গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন তিনি। কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য এবং পরিবারের সহযোগিতায় সেই স্বপ্ন আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে।
বর্তমানে তার খামারে শাহিওয়াল, ফাইটার এবং ওয়েস্টার্ন ফ্রিজিয়ানসহ বিভিন্ন জাতের গরু রয়েছে। আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশীয় পদ্ধতিতে গরুগুলোকে লালন-পালন করে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।
প্রাকৃতিক উপায়ে গরু মোটাতাজাকরণ
ফারিয়া জানান, তার খামারের পশুগুলোকে কোনো ক্ষতিকর উপাদান ছাড়াই সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে বড় করা হয়। খড়, ঘাস এবং পুষ্টিকর দানাদার খাদ্য দিয়ে গরুগুলোকে পরিচর্যা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। তাই আমরা দেশীয় ও নিরাপদ পদ্ধতিতেই গরু লালন-পালন করছি।”
গরুর খামারের সঙ্গে বহুমুখী কৃষি উদ্যোগ
শুধু গরু পালনেই সীমাবদ্ধ থাকেননি ফারিয়া। তার খামারে রয়েছে ছাগল পালন, কবুতর পালন এবং মাছ চাষের ব্যবস্থাও। ফলে ‘ফাহিয়ান অ্যাগ্রো ফার্ম’ এখন একটি বহুমুখী কৃষি উদ্যোগে পরিণত হয়েছে।
এতে আয় বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়েছে।
সমালোচনা পেরিয়ে সফলতা
নারী হিসেবে খামার পরিচালনার শুরুতে নানা বাধা ও কটূক্তির মুখোমুখি হতে হয়েছিল ফারিয়াকে। অনেকেই তার উদ্যোগকে গুরুত্ব দেননি, আবার কেউ কেউ নেতিবাচক মন্তব্যও করেছেন।
ফারিয়া বলেন, “শুরুতে অনেকেই আমাকে নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য করতেন। একজন নারী হয়ে খামার পরিচালনা করা নিয়ে অনেক কথা শুনতে হয়েছে। কিন্তু আমি কখনো থেমে যাইনি। নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে কাজ করে গেছি। আজ মানুষ যখন প্রশংসা করে, তখন মনে হয় পরিশ্রম সার্থক হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “খামারে যারা কাজ করছেন, তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে পেরেছি—এটিও আমার জন্য বড় প্রাপ্তি।”
স্বামীর সহযোগিতায় এগিয়ে যাওয়া
নিজের সফলতার পেছনে স্বামী মো. সুমন খানের অবদানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন ফারিয়া।
তার ভাষায়, “শুরু থেকেই স্বামীর সাহস ও সহযোগিতা পেয়েছি। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তার সমর্থন আমাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দিয়েছে।”
অন্য নারীদের জন্য অনুপ্রেরণা
স্থানীয়দের মতে, একসময় যারা ফারিয়ার উদ্যোগ নিয়ে সমালোচনা করতেন, এখন তারাই তার সফলতার প্রশংসা করছেন। একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে তার অর্জন এলাকার অনেক নারীকে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে উৎসাহিত করছে।
স্বপ্ন, সাহস, পরিশ্রম এবং আত্মবিশ্বাসের সমন্বয়ে ফারিয়া আক্তার ইলা প্রমাণ করেছেন—সুযোগের অপেক্ষা না করে নিজেই সুযোগ তৈরি করা যায়।
কৃষি বিভাগের সহযোগিতা
রাজাপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, “ফারিয়া একজন সফল নারী উদ্যোক্তা। তিনি দেশীয় পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজাকরণ করে খামার পরিচালনা করছেন। প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে আমরা নিয়মিত পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে আসছি।”
তিনি আরও বলেন, “তার এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং এলাকার অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণা। ভবিষ্যতে আরও অনেক নারী তার পথ অনুসরণ করে উদ্যোক্তা হিসেবে এগিয়ে আসবেন বলে আমরা আশা করি।”
একটি গরু দিয়ে শুরু হওয়া যাত্রা আজ ৬০টিরও বেশি গরুর সফল খামারে রূপ নিয়েছে। ফারিয়া আক্তার ইলার এই গল্প দেখিয়ে দেয়, অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রম থাকলে একজন নারীও কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা হিসেবে বড় সাফল্য অর্জন করতে পারেন।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!