ট্রাক চালক থেকে সফল আঙুরচাষী, তাক লাগালেন হেলাল
এক সময় জীবিকার তাগিদে ট্রাক চালাতেন। আজ তিনি একজন সফল আঙুরচাষী। দেশের আবহাওয়া আঙুর চাষের জন্য উপযোগী নয়—এমন প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সাতক্ষীরার হেলাল উদ্দিন গড়ে তুলেছেন ব্যতিক্রমী এক আঙুর বাগান। শুধু নিজেই সফল হননি, বাংলাদেশের মাটিতে মিষ্টি ও উন্নতমানের আঙুর উৎপাদন সম্ভব—সেটিও প্রমাণ করেছেন তিনি।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার লাবসা বাইপাস সড়ক এলাকার বাসিন্দা হেলাল উদ্দিনের আঙুর চাষের যাত্রা শুরু হয় মাত্র তিন বছর আগে। ইউটিউবে বিভিন্ন ভিডিও দেখে আগ্রহ জন্মায় তার। সেই আগ্রহ থেকেই বাড়ির আঙিনায় দুটি আঙুরের চারা রোপণ করেন। প্রথমবারেই প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফলন পাওয়ায় আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। এরপর তিনি বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষের সিদ্ধান্ত নেন।
শখ থেকে বাণিজ্যিক আঙুর বাগান
প্রাথমিক সাফল্যের পর লাবসা বাইপাস এলাকায় ১৫ কাঠা জমি বর্গা নিয়ে আঙুরের বাগান গড়ে তোলেন হেলাল। বর্তমানে তার বাগানে রয়েছে আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ইউক্রেন ও ইতালিসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় ২০ জাতের আঙুর।
সবুজ পাতার ছায়ায় ঝুলে থাকা লাল, কালো, হলুদ ও সবুজ রঙের আঙুরের থোকা এখন দর্শনার্থীদেরও আকৃষ্ট করছে। প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ তার বাগান দেখতে আসছেন।
স্ত্রী ছিলেন সবচেয়ে বড় সহযাত্রী
হেলালের এই সফলতার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তার স্ত্রী আলেয়া বেগম। তিনি জানান, শুরুতে দুই হাজার টাকা দিয়ে দুটি আঙুরের চারা কেনার বিষয়টি তার কাছে অপচয় বলেই মনে হয়েছিল।
“আমি তখন বলেছিলাম, বাংলাদেশে আবার আঙুর হয় নাকি? মনে হয়েছিল টাকাগুলো নষ্ট হলো। কিন্তু কিছুদিন পর গাছে ফল আসার পর আমাদের ধারণা বদলে যায়। আঙুরগুলো ছিল খুবই মিষ্টি ও সুস্বাদু। এরপরই আমরা বড় পরিসরে চাষের সিদ্ধান্ত নিই,” বলেন তিনি।
বর্তমানে তাদের বাগানে বিভিন্ন জাতের মোট ১২৬টি আঙুরগাছ রয়েছে।
প্রথম বিক্রিতেই উঠে এসেছে খরচ
হেলাল উদ্দিন জানান, ১৫ কাঠা জমি বর্গা নিতে খরচ হয়েছে ১৫ হাজার টাকা। জমি প্রস্তুত, মাচা তৈরি, চারা সংগ্রহ ও পরিচর্যাসহ মোট বিনিয়োগ ছিল প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা।
তবে প্রথম চালানের আঙুর বিক্রি করেই তিনি পুরো বিনিয়োগ তুলে আনতে সক্ষম হয়েছেন।
তার ভাষায়, “আঙুর চাষে মূল খরচ একবারই করতে হয়। এরপর নিয়মিত পরিচর্যা ছাড়া বড় ধরনের খরচ নেই। একটি গাছ ৪০ থেকে ৫০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে এবং বছরের বিভিন্ন সময় ফল দেয়।”
তিনি জানান, ফেব্রুয়ারি মাসে আঙুরের উৎপাদন সবচেয়ে বেশি হয়।
বাংলাদেশের মাটিতেও সম্ভব উন্নতমানের আঙুর
হেলাল উদ্দিনের বাগানে বর্তমানে কালো, লাল, সবুজ ও হলুদ রঙের বিভিন্ন জাতের আঙুর রয়েছে। তিনি ইতোমধ্যে আরও এক বিঘা জমি বর্গা নিয়ে আঙুর চাষ সম্প্রসারণের কাজ শুরু করেছেন।
তার মতে, সঠিক জাত নির্বাচন, আধুনিক প্রযুক্তি এবং নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে বাংলাদেশের মাটিতেও আন্তর্জাতিক মানের মিষ্টি আঙুর উৎপাদন করা সম্ভব।
সম্ভাবনা দেখছেন স্থানীয়রাও
বাগান দেখতে আসা স্থানীয় বাসিন্দা মানিক চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, কৃষি বিভাগ প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিলে দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিদেশেও আঙুর রপ্তানি করা সম্ভব হতে পারে।
কৃষি বিভাগের আশাবাদ
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম জানান, নতুন ফসল হিসেবে জেলায় আঙুর চাষের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, “সাতক্ষীরা সদর ও কলারোয়া উপজেলায় ইতোমধ্যে কয়েকজন উদ্যোক্তা আঙুর চাষ শুরু করেছেন। বিভিন্ন জাতের আঙুরের ফলন আশাব্যঞ্জক। উৎপাদন বাড়াতে পারলে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের অন্যান্য জেলাতেও সরবরাহ করা সম্ভব হবে।”
তিনি আরও বলেন, সাতক্ষীরার আম ও কুল যেমন স্বাদের জন্য পরিচিত, তেমনি আঙুরের ক্ষেত্রেও যদি একই মান নিশ্চিত করা যায়, তাহলে বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা তৈরি হবে।
স্বপ্ন দেখাচ্ছেন নতুন উদ্যোক্তাদের
ট্রাকের স্টিয়ারিং ছেড়ে আঙুর বাগানে সময় দেওয়া হেলাল উদ্দিন এখন অনেকের কাছে অনুপ্রেরণার নাম। সাহস, অধ্যবসায় এবং নতুন কিছু করার ইচ্ছা থাকলে যে প্রচলিত ধারণাকে বদলে দিয়ে সফল হওয়া যায়, তারই উজ্জ্বল উদাহরণ তিনি।
বাংলাদেশের মাটিতে আঙুর চাষ অসম্ভব—এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে তিনি দেখিয়েছেন, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে বিদেশি ফলও হতে পারে লাভজনক কৃষি উদ্যোগের নতুন সম্ভাবনা।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!