হারিকেনের আলো থেকে হাঁসশিল্পের রাজধানী!
একসময় দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও অনিশ্চয়তায় ঘেরা ছিল সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ ইউনিয়নের মহেশরৌহালী গ্রাম। জীবিকার সন্ধানে গ্রামের মানুষকে ছুটতে হতো বিভিন্ন অঞ্চলে। তবে সময়ের ব্যবধানে সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। বর্তমানে দেশের অন্যতম বৃহৎ হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে এই গ্রাম। প্রতিদিন এখান থেকে লাখ লাখ হাঁসের বাচ্চা দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হচ্ছে, আর সেই শিল্পকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে স্বাবলম্বী এক জনপদ।
এক ব্যক্তির স্বপ্নে বদলে গেল গ্রামের ভাগ্য
মহেশরৌহালীর এই সফলতার গল্প শুরু হয় ১৯৯৫ সালে। গ্রামের বাসিন্দা শাহ আলম হারিকেনের তাপ এবং ধানের তুষ ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে হাঁসের ডিম ফুটানোর একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নেন। সে সময় অনেকেই বিষয়টিকে অবাস্তব বলে মনে করেছিলেন। তবে দীর্ঘদিনের গবেষণা, ধৈর্য এবং নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন যে কৃত্রিম উপায়ে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন করে বাণিজ্যিকভাবে সফল হওয়া সম্ভব।
শাহ আলমের সেই ছোট উদ্যোগই পরবর্তীতে পুরো গ্রামের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করে।
আধুনিক প্রযুক্তিতে গড়ে উঠেছে শতাধিক হ্যাচারি
সময় ও প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে হারিকেন ও ধানের তুষের ব্যবহার এখন ইতিহাস। বর্তমানে গ্রামটিতে আধুনিক বৈদ্যুতিক ইনকিউবেটরভিত্তিক ছোট-বড় প্রায় ১২০টি হ্যাচারি গড়ে উঠেছে।
খামারিদের তথ্য অনুযায়ী, এসব হ্যাচারিতে প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ হাঁসের বাচ্চা উৎপাদিত হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের খামারিরা এখান থেকে বাচ্চা সংগ্রহ করে নিজেদের খামারে পালন করেন।
হাঁসশিল্প ঘিরে কর্মসংস্থান
মহেশরৌহালীর প্রায় প্রতিটি পরিবার কোনো না কোনোভাবে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। ডিম সংগ্রহ, বাছাই, ইনকিউবেটর পরিচালনা, বাচ্চা পরিচর্যা, পরিবহন ও বিপণন—সব ক্ষেত্রেই নারী-পুরুষ সমানভাবে অংশ নিচ্ছেন।
ফলে গ্রামে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। যে গ্রামে একসময় দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী, সেখানে এখন অনেক পরিবার আর্থিকভাবে স্বচ্ছল জীবনযাপন করছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সালাম বলেন, “আগে মানুষের সংসার চালানোই ছিল কষ্টকর। এখন প্রায় প্রতিটি পরিবার হাঁসের বাচ্চা উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। সারাদিন সবাই উৎপাদন ও সরবরাহের কাজে ব্যস্ত থাকে।”
কোটি টাকার বাজার
উৎপাদনকারীরা সাধারণত একদিন বয়সী হাঁসের বাচ্চা প্রতি পিস ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় পাইকারি বিক্রি করেন। তবে খুচরা বাজারে একই বাচ্চার দাম ৮০ থেকে ৯০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।
বিশেষ করে ডিম উৎপাদনের জন্য জনপ্রিয় খাকি ক্যাম্পবেল ও ইন্ডিয়ান রানার জাতের হাঁসের বাচ্চার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। বর্ষা মৌসুম এবং শীতের শুরুতে চাহিদা বাড়ার কারণে দামও বৃদ্ধি পায়।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাচ্ছে মহেশরৌহালীর হাঁসের বাচ্চা
এই গ্রামের উৎপাদিত খাকি ক্যাম্পবেল, বেইজিং এবং ইন্ডিয়ান রানার জাতের হাঁসের বাচ্চার চাহিদা রয়েছে দেশের প্রায় সব অঞ্চলে।
প্রতিদিন কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল, নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, বরিশাল, কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহসহ বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা এখানে আসেন। বিশেষ খাঁচায় প্যাকেটজাত করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয় এসব হাঁসের বাচ্চা।
ক্ষুদ্র বিনিয়োগে বড় সাফল্য
সফল উদ্যোক্তাদের একজন জামাল উদ্দিন জানান, মাত্র ৫০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে ছোট একটি ইনকিউবেটর দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন তিনি। বর্তমানে প্রায় ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে দুটি বড় ইনকিউবেটর পরিচালনা করছেন।
প্রতি মাসে প্রায় ৩০ হাজার হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন করে তিনি সাড়ে তিন লাখ টাকারও বেশি আয় করছেন।
অন্যদিকে উদ্যোক্তা আলম ফকির জানান, একসঙ্গে ২০ থেকে ২৫ হাজার ডিম ইনকিউবেটরে রাখা হয়। পাবনা, নাটোর, রাজশাহী, ফরিদপুর ও সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে ডিম সংগ্রহ করে বাণিজ্যিকভাবে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন করছেন তারা।
সরকারি সহায়তা পেলে আরও সম্প্রসারণ সম্ভব
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ.কে.এম. আনোয়ারুল হক জানান, মহেশরৌহালীসহ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে বর্তমানে প্রায় ৬০০টি খামার রয়েছে। অধিকাংশ মানুষই কোনো না কোনোভাবে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
তিনি বলেন, প্রাণিসম্পদ বিভাগ নিয়মিত প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত পরামর্শ ও ভ্যাকসিন সরবরাহ করছে। স্বল্পসুদে ঋণ এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানো গেলে এই শিল্প আরও বিস্তৃত হবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।
গ্রাম বদলের অনন্য দৃষ্টান্ত
একজন মানুষের উদ্ভাবনী চিন্তা, সাহস ও পরিশ্রম কীভাবে একটি গ্রামের অর্থনৈতিক চিত্র পাল্টে দিতে পারে, তার জীবন্ত উদাহরণ মহেশরৌহালী। হারিকেনের ক্ষীণ আলো আর ধানের তুষের উষ্ণতায় শুরু হওয়া সেই যাত্রা আজ লাখ লাখ হাঁসের বাচ্চা উৎপাদনের বৃহৎ শিল্পে পরিণত হয়েছে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে মহেশরৌহালী এখন দেশের জন্য এক অনুকরণীয় মডেল। হাঁসশিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই গ্রামের গল্প প্রমাণ করে, সঠিক উদ্যোগ ও পরিশ্রম থাকলে একটি ছোট গ্রামও বদলে দিতে পারে হাজারো মানুষের জীবন।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!