Dark Mode
Image
  • Tuesday, 23 June 2026
মৌলভীবাজারে মধু চাষের নীরব বিপ্লব, শত শত পরিবারের আয়ের নতুন পথ

মৌলভীবাজারে মধু চাষের নীরব বিপ্লব, শত শত পরিবারের আয়ের নতুন পথ

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় স্বল্প পুঁজিতে লাভজনক কৃষি উদ্যোগ হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে মধু চাষ। একসময় পাহাড়ি বন থেকে মধু সংগ্রহের ওপর নির্ভরশীল মানুষ এখন ঘরের আঙিনাতেই বাণিজ্যিকভাবে মধু উৎপাদন করছেন। উপজেলার প্রায় ৩০টি গ্রামের অন্তত ৬০০ পরিবার বর্তমানে মধু চাষের সঙ্গে যুক্ত, যা এলাকায় এক ধরনের নীরব অর্থনৈতিক বিপ্লবের জন্ম দিয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় এক দশক আগে কমলগঞ্জ উপজেলার কাঠালকান্দি গ্রামের মধু চাষি আব্দুল গফুর পাহাড়ি এক বন্ধুর কাছ থেকে রানি মৌমাছির গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে পারেন। পরে তিনি একটি রানি মৌমাছি সংগ্রহ করে বিশেষভাবে তৈরি বাঁশের চুঙ্গিতে সংরক্ষণ করেন। রানি মৌমাছিকে ঘিরে ধীরে ধীরে কর্মী মৌমাছির দল জমা হতে থাকে এবং সেখান থেকেই শুরু হয় তার মধু চাষের যাত্রা।

প্রথমদিকে সনাতনী পদ্ধতিতে চাষাবাদ করলেও পরে প্রশিক্ষণ নিয়ে আধুনিক কাঠের বাক্স পদ্ধতি গ্রহণ করেন তিনি। বর্তমানে তার বাড়ির চারপাশে সারি সারি মৌমাছির বাক্স দেখা যায়, যেগুলো থেকেই নিয়মিত মধু সংগ্রহ করা হয়।

আব্দুল গফুর জানান, মধুর চাহিদা সবসময়ই বেশি। ফলে উৎপাদিত মধু বিক্রির জন্য আলাদা বাজার খুঁজতে হয় না। ক্রেতারা সরাসরি খামারে এসে খাঁটি মধু সংগ্রহ করেন। তবে খরা, অতিবৃষ্টি এবং ফুলের উৎস কমে যাওয়ায় মাঝে মাঝে উৎপাদনে কিছুটা প্রভাব পড়ে।

কমলগঞ্জের আরেক সফল মধু চাষি বদরুজ্জামান, যিনি স্থানীয়ভাবে ‘মধু মঙ্গল’ নামে পরিচিত। মাত্র ১৫০ টাকার একটি কাঠের বাক্স দিয়ে শুরু করা তার উদ্যোগ এখন বড় আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে তার নিজস্ব ৬০টিরও বেশি মৌচাক রয়েছে। এসব থেকে বছরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মধু উৎপাদন করে তিনি লাখ টাকারও বেশি আয় করছেন।

তিনি জানান, একটি মৌচাক থেকে বছরে ৫ থেকে ১০ কেজি পর্যন্ত মধু সংগ্রহ করা সম্ভব। বর্তমানে প্রতি লিটার মধু ১,৫০০ থেকে ১,৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি রানি মৌমাছিসহ একটি মৌচাকের দাম ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়।

কমলগঞ্জ উপজেলা মধু চাষি উন্নয়ন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পুরো জেলায় প্রায় ৪ হাজারের বেশি মৌমাছির বাক্স স্থাপন করা হয়েছে। উপজেলার জালালিয়া, বালিগাঁও, ইটখোলা, রাজটিলা, মাধবপুর, ধলাইপাড়, সলিমবাজার, কাঠালকান্দি, কালারবিল, বনগাঁওসহ বহু গ্রামে মধু চাষ ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছে।

পরিষদের সভাপতি আলতাফ মাহমুদ বাবুল বলেন, “মধু চাষে বাড়তি শ্রম বা সময়ের প্রয়োজন হয় না। ফলে কৃষিকাজের পাশাপাশি অনেক পরিবার এটি করে বাড়তি আয় করছে। বর্তমানে প্রায় ৬০০ পরিবার এই পেশার সঙ্গে জড়িত।”

অন্যদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাখন চন্দ্র সূত্রধর বলেন, “মধু চাষিদের প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

স্থানীয়দের মতে, স্বল্প পুঁজিতে অধিক লাভ, সহজ ব্যবস্থাপনা এবং বাজারের উচ্চ চাহিদার কারণে কমলগঞ্জে মধু চাষ এখন একটি সম্ভাবনাময় শিল্পে পরিণত হয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি এটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

Comment / Reply From