২০ বছর পর মাঠে ফিরেছে চিকন পটল, লাভে উজ্জ্বল কৃষকের মুখ
প্রায় দুই দশক পর আবারও কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার মাঠে দেখা মিলছে একসময়কার জনপ্রিয় চিকন পটলের। উন্নত জাতের চারা, ভালো ফলন এবং বাজারে চাহিদা বৃদ্ধির কারণে নতুন করে এই ফসলের চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন স্থানীয় কৃষকরা। ফলে দীর্ঘদিন হারিয়ে থাকা ঐতিহ্যবাহী এই সবজি আবারও ফিরেছে কৃষকের জমিতে, ফিরেছে আশার আলো।
বরুড়া উপজেলার শিলমুড়ি দক্ষিণ ইউনিয়নের মনোহরা গ্রামে পরীক্ষামূলকভাবে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) উদ্ভাবিত বারি পটল-১ ও বারি পটল-২ জাতের পটল চাষ করেছেন কৃষক এতিম আলী ও তার ভাই মো. সেলিম। তাদের জমিতে সবুজ মাচাজুড়ে ঝুলছে সাদা ডোরাকাটা অসংখ্য পটল। ফলনের ভারে নুয়ে পড়েছে মাচা, আর পরিবার নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন পটল সংগ্রহে।
হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের প্রত্যাবর্তন
কৃষক মো. সেলিম জানান, প্রায় ২০ বছর আগে এ অঞ্চলে চিকন পটলের ব্যাপক চাষ হতো। সুস্বাদু হওয়ায় বাজারেও এর চাহিদা ছিল উল্লেখযোগ্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে চারার সংকট ও বিভিন্ন কারণে এই চাষাবাদ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়।
তিনি বলেন, গত বছরের নভেম্বর মাসে বারি কুমিল্লা সরেজমিন গবেষণা বিভাগ থেকে বিনামূল্যে উন্নত জাতের চারা ও প্রয়োজনীয় সার সরবরাহ করা হয়। এরপর নতুন করে পটল চাষ শুরু করেন তারা।
বর্তমানে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৩০ কেজি পটল সংগ্রহ করছেন বলে জানান তিনি। ইতোমধ্যে প্রায় ১৮০ কেজি পটল বিক্রি করেছেন এবং স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি গড়ে ৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অক্টোবর পর্যন্ত নিয়মিত ফলন পাওয়ার আশা করছেন তিনি।
লাভজনক ফসল হিসেবে জনপ্রিয়তা বাড়ছে
একইভাবে পাশের লগ্নসার গ্রামের কৃষক অজিত কুমার দাশ ২০ শতক জমিতে পটল চাষ করছেন। তার মতে, অন্যান্য অনেক ফসলের তুলনায় পটল চাষে খরচ কম হলেও বাজারে ভালো দাম পাওয়া যায়। ফলে এটি ধীরে ধীরে কৃষকদের কাছে লাভজনক ফসল হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
চান্দিনা উপজেলার বড় গোবিন্দপুর গ্রামের কৃষক শাকিল হোসেনও ১০ শতক জমিতে পটল চাষ করে ইতিবাচক ফল পাচ্ছেন।
বারির উন্নত জাতের সাফল্য
বারি কুমিল্লা সরেজমিন গবেষণা বিভাগের বৈজ্ঞানিক সহকারী শিরিন আক্তার জানান, মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পটলের ফলন পাওয়া যায়। একই গাছ থেকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছরও ফলন নেওয়া সম্ভব হওয়ায় কৃষকদের উৎপাদন খরচ কমে এবং লাভের পরিমাণ বাড়ে।
তিনি বলেন, বারি পটল-১ দ্রুত ফলনশীল জাত। রোপণের প্রায় ৯০ দিনের মধ্যেই ফলন শুরু হয়। প্রতি গাছে গড়ে প্রায় ৩৮০টি ফল ধরে এবং হেক্টরপ্রতি ৩৫ থেকে ৪০ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। অন্যদিকে বারি পটল-২ আকারে তুলনামূলক বড় এবং হেক্টরপ্রতি প্রায় ৩০ টন ফলন দিতে সক্ষম।
সঠিক পরিচর্যায় বাড়বে উৎপাদন
বারি কুমিল্লা সরেজমিন গবেষণা বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. জামাল উদ্দিন বলেন, সুষম সার প্রয়োগ, সময়মতো মাচা তৈরি এবং কৃত্রিম পরাগায়ন নিশ্চিত করতে পারলে পটলের ফলন আরও বৃদ্ধি করা সম্ভব।
তার মতে, জমিতে অন্তত ১০ শতাংশ পুরুষ গাছ রাখা প্রয়োজন, যাতে সঠিকভাবে পরাগায়ন হয়। এছাড়া নভেম্বর মাস পটলের চারা রোপণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।
তিনি আরও জানান, সঠিক ব্যবস্থাপনায় পটল চাষে প্রতি এক টাকা বিনিয়োগে তিন থেকে সাড়ে তিন টাকা পর্যন্ত লাভ অর্জন করা সম্ভব।
দীর্ঘদিন পর চিকন পটলের সফল প্রত্যাবর্তন শুধু কৃষকদের আয় বাড়াচ্ছে না, বরং কুমিল্লার হারিয়ে যাওয়া একটি কৃষি ঐতিহ্যকেও নতুন করে জীবিত করে তুলছে।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!