কাঁচা নাকি পাকা, কোন কলা বেশি উপকারী?
কলা পছন্দ করেন না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। সহজলভ্য এই ফল যেমন সুস্বাদু, তেমনি এতে রয়েছে শরীরের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান। তবে কাঁচা কলা আর পাকা কলার মধ্যে পুষ্টিগত কিছু পার্থক্য রয়েছে। পাকার মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কলার শর্করা, স্বাদ ও গঠনে পরিবর্তন আসে। ফলে হজম, রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ কিংবা ওজন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দুই ধরনের কলার ভূমিকা কিছুটা আলাদা হতে পারে।
তাহলে সুস্থ থাকতে কোনটি খাওয়া ভালো—কাঁচা, নাকি পাকা কলা? উত্তরটি নির্ভর করে আপনার শারীরিক অবস্থা, খাদ্যাভ্যাস এবং পুষ্টির প্রয়োজনের ওপর।
কাঁচা ও পাকা কলার পুষ্টিগত পার্থক্য
কাঁচা কলা সাধারণত সবুজ খোসার এবং তুলনামূলক শক্ত হয়। এ অবস্থায় কলার শর্করার বড় অংশ স্টার্চ হিসেবে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ, যা ক্ষুদ্রান্ত্রে পুরোপুরি হজম হয় না।
অন্যদিকে, কলা পাকতে থাকলে স্টার্চের একটি অংশ গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ ও সুক্রোজের মতো সরল শর্করায় রূপান্তরিত হয়। এ কারণে পাকা কলা তুলনামূলক মিষ্টি ও নরম হয়ে ওঠে।
দুই ধরনের কলাতেই পটাশিয়াম, ভিটামিন বি৬ ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান রয়েছে। তবে পাকার মাত্রা, কলার জাত এবং সংরক্ষণের অবস্থার ওপর নির্ভর করে পুষ্টি উপাদানের পরিমাণে কিছু পার্থক্য হতে পারে।
হজমের স্বাস্থ্যে কোনটি এগিয়ে?
কাঁচা কলায় থাকা রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ অন্ত্রে গিয়ে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার খাদ্য হিসেবে কাজ করতে পারে। অন্ত্রের অণুজীব এই স্টার্চ ভেঙে বিভিন্ন উপকারী উপাদান তৈরি করে, যা অন্ত্রের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই রান্না করা কাঁচা কলা অনেকের খাদ্যতালিকায় উপকারী সংযোজন হতে পারে। তবে রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ বেশি থাকায় কারও কারও পেটে গ্যাস বা ফাঁপা ভাবও দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে, পাকা কলা নরম হওয়ায় চিবিয়ে খাওয়া সহজ এবং অনেকের কাছে এটি বেশি আরামদায়ক। যাঁদের কাঁচা কলা খেলে পেট ফাঁপার সমস্যা হয়, তাঁরা পাকা কলা খেয়ে দেখতে পারেন।
তবে হজমের সমস্যা ব্যক্তিভেদে আলাদা। তাই একটি কলা সবার জন্য সমান উপকারী হবে, এমনটি বলা যায় না।
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে কোন কলা ভালো?
রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে কলার পাকার মাত্রার পাশাপাশি কতটুকু খাচ্ছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
কাঁচা কলায় রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ ও হজমে ধীরগতির স্টার্চ বেশি থাকায় শর্করা তুলনামূলক ধীরে হজম হতে পারে। অন্যদিকে, পাকা কলায় সরল শর্করার পরিমাণ বেশি থাকায় রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়ার ধরন কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।
তবে পাকা কলা মানেই রক্তে শর্করা হঠাৎ বেড়ে যাবে, এমন নয়। কলার পরিমাণ, পাকার মাত্রা, সঙ্গে অন্য কী খাবার খাচ্ছেন এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ওপর রক্তে শর্করার প্রতিক্রিয়া নির্ভর করে।
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারণত পরিমিত পরিমাণে কলা খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন। তবে নিজের রক্তে শর্করার অবস্থা ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরিমাণ নির্ধারণ করা ভালো।
ওজন নিয়ন্ত্রণে কোনটি উপকারী?
কাঁচা কলায় থাকা রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ হজমের প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে এবং কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা অনুভূতিতে সহায়তা করতে পারে। ফলে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এটি উপকারী হতে পারে।
অন্যদিকে, পাকা কলা সহজে খাওয়া যায় এবং শরীরে শক্তি জোগাতে পারে। শরীরচর্চা বা দৈনন্দিন কাজের আগে-পরে এটি সহজলভ্য ফল হিসেবে খাওয়া যায়।
তবে শুধু কাঁচা কলা খেলে ওজন কমবে কিংবা পাকা কলা খেলেই ওজন বাড়বে—এমন ধারণা ঠিক নয়। ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য মোট ক্যালরি গ্রহণ, সুষম খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম ও ঘুমের অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ।
কোন কলা কীভাবে খাবেন?
কাঁচা কলা সাধারণত তরকারি, ভর্তা, ভাজি কিংবা বিভিন্ন রান্নায় ব্যবহার করা হয়। সেদ্ধ বা রান্না করা কাঁচা কলা অনেকের দৈনন্দিন খাবারের ভালো সংযোজন হতে পারে।
অন্যদিকে, পাকা কলা সরাসরি খাওয়া যায়। এ ছাড়া ওটস, দই, স্মুদি কিংবা বিভিন্ন ঘরোয়া খাবারের সঙ্গে মিশিয়েও খেতে পারেন। অতিরিক্ত চিনি না মিশিয়ে পাকা কলা খেলে এর স্বাভাবিক মিষ্টি স্বাদ উপভোগ করা যায়।
যাঁরা হজমের সমস্যায় ভোগেন বা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখেন, তাঁদের জন্য কোন ধরনের কলা ও কতটুকু খাওয়া উপযোগী, তা নিজের শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী ঠিক করা প্রয়োজন।
তাহলে কাঁচা নাকি পাকা—কোনটি বেছে নেবেন?
রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চের জন্য কাঁচা কলার আলাদা উপকারিতা রয়েছে। অন্যদিকে, পাকা কলা নরম, মিষ্টি এবং সহজে খাওয়ার উপযোগী। দুই ধরনের কলাই পুষ্টিকর খাদ্যের অংশ হতে পারে।
আপনার যদি অন্ত্রের স্বাস্থ্য ও রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্ব পায়, তাহলে রান্না করা কাঁচা কলা ভালো বিকল্প হতে পারে। আর সহজে খাওয়া যায় এমন ফল হিসেবে পাকা কলাও খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, সুস্থ থাকার জন্য একটি নির্দিষ্ট ধরনের কলার ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। নিজের প্রয়োজন, হজমের সহনশীলতা ও সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস বিবেচনা করে কাঁচা ও পাকা—দুই ধরনের কলাই পরিমিত পরিমাণে খাওয়া যেতে পারে।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!