Dark Mode
Image
  • Wednesday, 28 October 2026
শীতের রসের অপেক্ষায় চুয়াডাঙ্গার গাছিরা

শীতের রসের অপেক্ষায় চুয়াডাঙ্গার গাছিরা

দিনের হালকা গরম, রাতের ঠান্ডা আর ভোরের কুয়াশা জানান দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা। শীতকে ঘিরে চুয়াডাঙ্গার গ্রামাঞ্চলে শুরু হয়েছে খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির প্রস্তুতি। ধারালো দা হাতে খেজুর গাছে উঠে শুকনো অংশ পরিষ্কার করছেন গাছিরা। কেউ গাছের আগাছা ও বাড়তি ডালপালা সরাচ্ছেন, কেউ আবার রস সংগ্রহের উপযোগী করে তুলছেন গাছের কাণ্ড।

আর কয়েক সপ্তাহ পরই গাছের গায়ে ঝুলবে মাটির হাঁড়ি। সারারাত ফোঁটা ফোঁটা করে জমবে মিষ্টি খেজুরের রস। সকালে সেই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হবে তরল গুড়, দানা গুড় ও পাটালি। শীতের এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজন ঘিরে চুয়াডাঙ্গার গাছিদের মধ্যে এখন ব্যস্ততা বাড়ছে।

জেলায় রয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭২ হাজার খেজুর গাছ

চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার চার উপজেলায় মাঠ ও সড়কের দুই পাশে রয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭২ হাজার খেজুর গাছ। জীবননগর, দামুড়হুদা, দর্শনা ও আলমডাঙ্গা এলাকায় এসব গাছের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।

ইতোমধ্যে জেলার প্রায় ২০ শতাংশ খেজুর গাছ প্রস্তুত করা হয়েছে। গাছের শুকনো অংশ ছাঁটাই, কাণ্ড পরিষ্কার এবং রস সংগ্রহের উপযোগী করার কাজ চলছে। খেজুর গাছ বেশি রয়েছে এমন এলাকায় গাছিরা অস্থায়ী ঘাঁটি গড়ে তুলেছেন। রস জ্বাল দেওয়ার জন্য জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে শুকিয়ে রাখা হচ্ছে খেজুর গাছের ডালপালাও।

কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, একটি খেজুর গাছ থেকে মৌসুমে প্রায় ১০ থেকে ১১ কেজি গুড় উৎপাদন করা সম্ভব। তবে উৎপাদনের পরিমাণ আবহাওয়া, গাছের অবস্থা এবং পরিচর্যার ওপর নির্ভর করে।

এবার গুড় উৎপাদনের লক্ষ্য ২ হাজার ৭০০ টন

চলতি শীত মৌসুমে চুয়াডাঙ্গা জেলায় ২ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন খেজুরের গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি বিভাগ। আগের মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন।

গত মৌসুমে খেজুরের রস ও গুড় বিক্রি করে প্রায় ৭৫ কোটি টাকা আয় হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে উৎপাদন বাড়বে বলে আশা করছেন কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা।

শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খেজুর গাছ থেকে রসের প্রবাহও সাধারণত বাড়ে। ফলে পর্যাপ্ত শীত পড়া এবং গাছের যথাযথ পরিচর্যা এ মৌসুমে উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

গাছ প্রস্তুতের কাজে ব্যস্ত গাছিরা

দামুড়হুদা ও দর্শনা এলাকার গাছিরা জানান, শীত পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই তাঁরা গাছ প্রস্তুতের কাজ শুরু করেছেন। মৌসুমের শুরুতে শ্রমিক সংকট এড়ানো এবং সময়মতো রস সংগ্রহ করতে আগেভাগেই পরিচর্যার কাজ এগিয়ে রাখছেন তাঁরা।

গাছিদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে গাছের শুকনো অংশ ও বাড়তি ডালপালা সরিয়ে কাণ্ড পরিষ্কার করা হয়। এরপর কয়েক দফায় গাছের নির্দিষ্ট অংশ চেঁছে রস বের হওয়ার উপযোগী করা হয়। পর্যায়ক্রমে সেখানে নলি বসিয়ে মাটির হাঁড়ি ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।

একটি গাছ থেকে কয়েক দিন রস সংগ্রহের পর কিছুদিন বিরতি দেওয়া হয়। এরপর গাছ আবার প্রস্তুত করে নতুন করে রস সংগ্রহ করা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার প্রয়োজন হয়। সঠিকভাবে গাছ প্রস্তুত করা না গেলে রসের পরিমাণ ও মান—দুটিই প্রভাবিত হতে পারে।

গাছিরা জানান, শীতের মৌসুমে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির কাজ ঘিরে তাঁদের কর্মব্যস্ততা বেড়ে যায়। একজন শ্রমিক প্রতিদিন প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি গাছ প্রস্তুত করতে পারেন। এ কাজে দৈনিক ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি দেওয়া হয় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

রস থেকে গুড় তৈরির ঐতিহ্য

খেজুরের রস সংগ্রহ থেকে সুস্বাদু গুড় তৈরি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই রয়েছে শ্রম ও দক্ষতার প্রয়োজন। রাতে গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হাঁড়িতে রস জমে। ভোরে সেই রস সংগ্রহ করে দ্রুত জ্বাল দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

চুলায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্বাল দেওয়ার পর রস ধীরে ধীরে ঘন হয়ে আসে। এরপর তা থেকে তৈরি হয় তরল বা ঝোল গুড়, দানা গুড় এবং পাটালি। রসের মান, জ্বাল দেওয়ার সময় ও তাপমাত্রার ওপর গুড়ের রং, ঘনত্ব এবং স্বাদ নির্ভর করে।

চুয়াডাঙ্গার খেজুরের গুড়ের সুনাম রয়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি এ জেলার গুড় দেশের অন্যান্য জেলাতেও সরবরাহ করা হয়। ফলে শীতের এই মৌসুমি পণ্য ঘিরে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও তৈরি হয় বাড়তি কর্মচাঞ্চল্য।

খেজুরের গুড়ের চাহিদা ঘিরে কর্মসংস্থান

খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির সঙ্গে চুয়াডাঙ্গার প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার গাছি জড়িত বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তাঁদের পাশাপাশি রস পরিবহন, জ্বালানি সংগ্রহ, গুড় তৈরি ও বাজারজাতকরণের কাজেও বহু মানুষের কর্মসংস্থান হয়।

স্থানীয় গাছিরা জানান, মৌসুমে গাছ প্রস্তুত, হাঁড়ি বসানো, রস সংগ্রহ এবং গুড় তৈরির কাজ একসঙ্গে সামলাতে হয়। তাই শীতের শুরুতেই প্রস্তুতি নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক সময়ে কাজ শুরু করতে পারলে রস সংগ্রহের মৌসুমের বড় অংশ কাজে লাগানো সম্ভব হয়।

আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করছে উৎপাদন

চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নূরুল ইসলাম বলেন, জেলার খেজুরের গুড়ের সুনাম সারা দেশে রয়েছে। গুণগত মান ভালো হওয়ায় বিভিন্ন জেলায় এ গুড়ের চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে শীতের শুরুতেই গাছিরা গাছ পরিচর্যা ও প্রস্তুতির কাজে ব্যস্ত।

তিনি জানান, জেলার প্রায় ২০ শতাংশ খেজুর গাছ ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং পর্যাপ্ত শীত পড়লে চলতি মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।

শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে সঙ্গে চুয়াডাঙ্গার গ্রামাঞ্চলে তাই বাড়ছে ব্যস্ততা। গাছের পরিচর্যা থেকে শুরু করে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে নতুন মৌসুমের অপেক্ষায় গাছিরা। এখন তাঁদের প্রত্যাশা, অনুকূল আবহাওয়ায় এবারও খেজুরের মিষ্টি রস ও গুড়ে সমৃদ্ধ হবে জেলার গ্রামীণ অর্থনীতি। 

Comment / Reply From