হারের পর হঠাৎ বেশি খাবার কেন বিপজ্জনক?
দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত খাবার না পেয়ে অপুষ্টিতে ভোগা একজন মানুষের সামনে হঠাৎ প্রচুর খাবার তুলে দেওয়া হলে স্বাভাবিকভাবেই মনে হতে পারে, এতে দ্রুত শক্তি ফিরে আসবে। কিন্তু বাস্তবে সব সময় এমনটি ঘটে না। দীর্ঘদিন অনাহার বা গুরুতর অপুষ্টির পর হঠাৎ বেশি খাবার গ্রহণ করলে শরীরে এমন একটি জটিলতা তৈরি হতে পারে, যা গুরুতর ক্ষেত্রে জীবননাশের ঝুঁকি বাড়ায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে বলা হয় ‘রিফিডিং সিনড্রোম’ (Refeeding Syndrome)।
এটি এমন একটি শারীরবৃত্তীয় জটিলতা, যেখানে দীর্ঘ সময় অপর্যাপ্ত পুষ্টি গ্রহণের পর আবার খাবার শুরু করলে শরীরের বিপাকক্রিয়া, খনিজ উপাদান ও তরলের ভারসাম্যে আকস্মিক পরিবর্তন ঘটে। এর ফলে হৃদযন্ত্র, শ্বাসপ্রশ্বাস ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।
হঠাৎ খাবার খেলে শরীরে কী ঘটে?
দীর্ঘ সময় খাবার কম পেলে শরীর শক্তি পাওয়ার জন্য নিজের সঞ্চিত চর্বি ও প্রোটিন ব্যবহার করতে শুরু করে। এ সময় শরীরের বিপাকীয় কার্যক্রমে পরিবর্তন আসে এবং ইনসুলিনের মাত্রা সাধারণত কম থাকে।
এরপর হঠাৎ বেশি পরিমাণে খাবার, বিশেষ করে শর্করাজাতীয় খাবার গ্রহণ করলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়ে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইনসুলিনের নিঃসরণ বেড়ে যায়। ফলে গ্লুকোজের পাশাপাশি ফসফেট, পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান রক্ত থেকে কোষের ভেতরে প্রবেশ করতে থাকে।
এতে রক্তে এসব উপাদানের মাত্রা দ্রুত কমে যেতে পারে। পাশাপাশি শরীরে সোডিয়াম ও পানির ভারসাম্যেও পরিবর্তন ঘটে। দীর্ঘদিনের অপুষ্টির কারণে আগে থেকেই এসব খনিজের সঞ্চয় কমে থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
রিফিডিং সিনড্রোমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো রক্তে ফসফেটের মাত্রা কমে যাওয়া, যাকে বলা হয় ‘হাইপোফসফেটেমিয়া’। তবে শুধু ফসফেট নয়, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম এবং ভিটামিন বি১ বা থায়ামিনের ঘাটতিও গুরুতর জটিলতার কারণ হতে পারে।
কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?
দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত খাবার না খেলেই সবার রিফিডিং সিনড্রোম হবে, এমন নয়। তবে গুরুতর অপুষ্টি বা দীর্ঘ সময় ধরে খুব কম খাবার গ্রহণের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বাড়ে।
বিশেষ করে যাঁদের ক্ষেত্রে নিচের বিষয়গুলো রয়েছে, তাঁদের বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন—
-
শরীরের ওজনের তুলনায় উচ্চতা অনুযায়ী ওজন অত্যন্ত কম বা গুরুতর অপুষ্টি রয়েছে।
-
গত তিন থেকে ছয় মাসে অনিচ্ছাকৃতভাবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ওজন কমেছে।
-
পাঁচ দিনের বেশি সময় ধরে খুব সামান্য খাবার খেয়েছেন বা প্রায় কিছুই খাননি।
-
দীর্ঘ সময় অপুষ্টিতে ভুগছেন কিংবা খাবার থেকে পুষ্টি শোষণে সমস্যা রয়েছে।
-
আগে থেকেই রক্তে ফসফেট, পটাশিয়াম বা ম্যাগনেশিয়ামের মাত্রা কম।
-
দীর্ঘদিন অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণের ইতিহাস রয়েছে।
-
কিছু ওষুধ বা দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার কারণে দীর্ঘ সময় পর্যাপ্ত পুষ্টি গ্রহণ সম্ভব হয়নি।
শুধু শরীরের ওজন কম হলেই ঝুঁকি নির্ধারণ করা যায় না। আবার রক্ত পরীক্ষায় প্রাথমিকভাবে খনিজ উপাদানের মাত্রা স্বাভাবিক থাকলেও শরীরের মোট সঞ্চয় কম থাকতে পারে। তাই ঝুঁকি নির্ধারণে চিকিৎসকের মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।
কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে?
খাবার পুনরায় শুরু করার পর প্রথম কয়েক দিনের মধ্যেই রিফিডিং সিনড্রোমের লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। লক্ষণগুলোর তীব্রতা ব্যক্তিভেদে আলাদা হয়।
প্রাথমিকভাবে দেখা দিতে পারে দুর্বলতা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, পেশিতে দুর্বলতা কিংবা শরীরে পানি জমে হাত-পা ফুলে যাওয়া। পরে খনিজ উপাদানের ভারসাম্য গুরুতরভাবে নষ্ট হলে আরও জটিল উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
যেমন—
-
শ্বাসকষ্ট বা শ্বাস নিতে অসুবিধা।
-
হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক হয়ে যাওয়া।
-
বিভ্রান্তি, অস্বাভাবিক আচরণ কিংবা চেতনার পরিবর্তন।
-
পেশিতে তীব্র দুর্বলতা বা খিঁচুনি।
-
শরীরে অতিরিক্ত পানি জমে ফোলাভাব বৃদ্ধি পাওয়া।
গুরুতর অবস্থায় হৃদযন্ত্রের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া, শ্বাসযন্ত্রের অকার্যকারিতা কিংবা একাধিক অঙ্গের কার্যক্ষমতা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। দীর্ঘ অনাহারের পর খাবার শুরু করার সময় এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।
প্রতিরোধে খাবার ধীরে ধীরে শুরু করা জরুরি
রিফিডিং সিনড্রোমের ক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন, বেশি খাবার খেলেই দ্রুত সুস্থ হওয়া যায় না। দীর্ঘদিন অনাহারে থাকা বা গুরুতর অপুষ্টিতে ভোগা ব্যক্তির পুষ্টি পুনরায় শুরু করতে হলে তাঁর শারীরিক অবস্থা ও ঝুঁকি বিবেচনা করে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।
জাতীয় স্বাস্থ্য ও পরিচর্যা উৎকর্ষবিষয়ক যুক্তরাজ্যের প্রতিষ্ঠান এনআইসিইর নির্দেশনা অনুযায়ী, রিফিডিং সমস্যার উচ্চঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের পুষ্টি ধীরে ধীরে বাড়াতে হয়। অত্যন্ত গুরুতর অপুষ্টির ক্ষেত্রে আরও সতর্কভাবে পুষ্টি শুরু করা এবং হৃদযন্ত্রের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হতে পারে।
এ ধরনের ব্যক্তির ক্ষেত্রে চিকিৎসক সাধারণত কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেন:
পুষ্টি ধাপে ধাপে বাড়ানো: ব্যক্তির পুষ্টিগত ঝুঁকি অনুযায়ী প্রাথমিকভাবে কতটুকু খাবার দেওয়া হবে এবং কীভাবে ধীরে ধীরে পরিমাণ বাড়ানো হবে, তা নির্ধারণ করা হয়।
ভিটামিনের ঘাটতি পূরণ: বিশেষ করে থায়ামিন বা ভিটামিন বি১-এর ঘাটতি প্রতিরোধে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের নির্দেশনায় সম্পূরক দেওয়া হতে পারে।
খনিজ উপাদান পরীক্ষা: রক্তে ফসফেট, পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে এসব উপাদানের ঘাটতি পূরণ করা হয়।
পানি ও হৃদযন্ত্রের অবস্থা পর্যবেক্ষণ: শরীরে পানি জমা, তরলের ভারসাম্য এবং হৃদস্পন্দনের পরিবর্তন হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
এসব পদক্ষেপ রোগীর ঝুঁকি অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হয়। তাই গুরুতর অপুষ্টিতে ভোগা ব্যক্তিকে নিজের সিদ্ধান্তে নির্দিষ্ট পরিমাণ খাবার, ভিটামিন কিংবা খনিজ সম্পূরক দিয়ে চিকিৎসা করার চেষ্টা করা উচিত নয়।
অনাহারের পর খাবার দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা কেন জরুরি?
রিফিডিং সিনড্রোমকে শুধু অত্যন্ত রোগা মানুষের সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা, খাদ্যগ্রহণে দীর্ঘ বিরতি, পুষ্টি শোষণের সমস্যা কিংবা অন্য কোনো কারণে অপুষ্টিতে ভোগা ব্যক্তিরও এ ধরনের জটিলতা হতে পারে।
বিশেষ করে দীর্ঘদিন প্রায় কিছুই না খাওয়া ব্যক্তিকে আবার নিয়মিত খাবারে ফিরিয়ে আনার আগে তাঁর পুষ্টিগত ঝুঁকি যাচাই করা প্রয়োজন। পরিস্থিতি অনুযায়ী হাসপাতালে ভর্তি রেখে পুষ্টি শুরু করা ও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনও হতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, দীর্ঘদিন না খাওয়া প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে একই ধরনের বিপদ ঘটবে। ঝুঁকি নির্ভর করে অপুষ্টির মাত্রা, কত দিন খাবার কম গ্রহণ করা হয়েছে, শারীরিক অবস্থা এবং অন্যান্য রোগের ওপর।
দ্রুত সুস্থ হওয়ার জন্য সঠিক পুষ্টিই আসল
দীর্ঘদিনের অনাহার বা অপুষ্টি কাটিয়ে ওঠার জন্য খাবার অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তবে পুষ্টি পুনরায় শুরু করার সময় খাবারের পরিমাণের পাশাপাশি তা কীভাবে এবং কত দ্রুত দেওয়া হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
রিফিডিং সিনড্রোমের ঝুঁকি আগে থেকে শনাক্ত করা, পুষ্টি ধীরে ধীরে বাড়ানো এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করার মাধ্যমে গুরুতর জটিলতা প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই দীর্ঘদিন অনাহারে থাকা কিংবা গুরুতর অপুষ্টিতে ভোগা ব্যক্তিকে হঠাৎ প্রচুর খাবার দেওয়ার পরিবর্তে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পুষ্টি পুনরায় শুরু করাই নিরাপদ।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!