ক্লান্তি নাকি ব্রেন টিউমার? যেসব লক্ষণ দেখলে আর দেরি নয়
বর্তমান ব্যস্ত জীবনে ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি বা মাথাব্যথা অনেকের কাছেই স্বাভাবিক ঘটনা। অফিসের চাপ, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব কিংবা মানসিক অবসাদের কারণে এমন সমস্যা প্রায়ই দেখা যায়। তবে চিকিৎসকদের মতে, কিছু ক্ষেত্রে এসব সাধারণ উপসর্গই হতে পারে মস্তিষ্কের মারাত্মক টিউমার গ্লিওব্লাস্টোমা (Glioblastoma)-এর প্রাথমিক সতর্কবার্তা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব ক্লান্তি বা মাথাব্যথা ব্রেন টিউমারের লক্ষণ নয়। কিন্তু যদি উপসর্গগুলো ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে এবং বিশ্রামের পরও না কমে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
গ্লিওব্লাস্টোমা কী?
গ্লিওব্লাস্টোমা হলো মস্তিষ্কের অত্যন্ত আক্রমণাত্মক এক ধরনের ক্যানসার, যা অ্যাস্ট্রোসাইট নামের কোষ থেকে তৈরি হয়।
অন্যান্য অনেক টিউমারের মতো এটি একটি নির্দিষ্ট গুটি তৈরি না করে সুস্থ মস্তিষ্কের টিস্যুর ভেতর শিকড়ের মতো ছড়িয়ে পড়ে। ফলে রোগের শুরুতে স্পষ্ট কোনো লক্ষণ দেখা যায় না এবং অনেকেই সাধারণ ক্লান্তি ভেবে বিষয়টি এড়িয়ে যান।
সাধারণ ক্লান্তি ও ব্রেন টিউমারের পার্থক্য
সাধারণ ক্লান্তি
- অতিরিক্ত কাজ বা মানসিক চাপের কারণে হয়।
- বিশ্রাম বা ভালো ঘুমের পর অনেকটাই কমে যায়।
- দৈনন্দিন কাজ স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।
গ্লিওব্লাস্টোমার ক্ষেত্রে
- বিশ্রাম নিলেও উপসর্গ কমে না।
- সময়ের সঙ্গে সমস্যা আরও বাড়তে থাকে।
- স্মৃতি, ভাষা, দৃষ্টিশক্তি বা শরীরের নড়াচড়ায় ধীরে ধীরে প্রভাব পড়ে।
স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া
সাধারণ মানসিক চাপে অনেকেই মাঝে মাঝে প্রয়োজনীয় জিনিস কোথায় রেখেছেন তা ভুলে যান।
কিন্তু ব্রেন টিউমারের ক্ষেত্রে—
- বারবার গুরুত্বপূর্ণ অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভুলে যাওয়া
- পরিচিত কাজ করতে গিয়ে বিভ্রান্ত হওয়া
- দীর্ঘদিনের পরিচিত হিসাব-নিকাশ করতে সমস্যা হওয়া
- পরিবারের সদস্যদের আগে পরিবর্তনটি চোখে পড়া
এসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
মাথাব্যথা কেমন হলে সতর্ক হবেন?
সাধারণ মাথাব্যথা সাধারণত বিশ্রাম, পানি পান বা ব্যথানাশক ওষুধে কমে যায়।
অন্যদিকে ব্রেন টিউমারের মাথাব্যথায়—
- ভোর বা রাতে ব্যথা বেশি হয়
- কাশি বা হাঁচি দিলে ব্যথা বাড়ে
- নিচু হয়ে কাজ করলে চাপ অনুভূত হয়
- বমিভাব বা বমি হতে পারে
আচরণ ও ব্যক্তিত্বে পরিবর্তন
গ্লিওব্লাস্টোমা মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব আক্রান্ত করলে দেখা দিতে পারে—
- অস্বাভাবিক খিটখিটে মেজাজ
- আবেগহীন আচরণ
- সামাজিকভাবে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া
- সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা
অনেক সময় এসব পরিবর্তন বিষণ্নতা বা মানসিক চাপ বলে ভুল করা হয়।
কথা বলতে সমস্যা
সাধারণ ক্লান্তিতে মাঝে মাঝে শব্দ খুঁজে পেতে দেরি হতে পারে।
কিন্তু ব্রেন টিউমারের ক্ষেত্রে—
- পরিচিত শব্দ ভুল বলা
- বাক্য শেষ করতে না পারা
- কথার মাঝে অস্বাভাবিক বিরতি নেওয়া
- বারবার ভুল শব্দ ব্যবহার করা
এসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
দৃষ্টিশক্তি ও ভারসাম্যের সমস্যা
নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে অবহেলা করবেন না—
- ঝাপসা দেখা
- একসঙ্গে দুটি ছবি দেখা
- হাঁটার সময় ভারসাম্য হারানো
- একপাশে বারবার ধাক্কা লাগা
- হাত থেকে জিনিস পড়ে যাওয়া
সবচেয়ে বিপজ্জনক সতর্কসংকেত
প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে প্রথমবার খিঁচুনি
যদি কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি জীবনে প্রথমবার খিঁচুনিতে আক্রান্ত হন, তাহলে দ্রুত নিউরোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
এছাড়া—
- হঠাৎ বিভ্রান্ত হয়ে যাওয়া
- কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্থির হয়ে যাওয়া
- হাত বা পায়ে অস্বাভাবিক ঝাঁকুনি
এসবও সতর্কতার বিষয়।
একাধিক লক্ষণ একসঙ্গে দেখা দিলে
চিকিৎসকদের মতে, একটি লক্ষণের চেয়ে একাধিক লক্ষণ একসঙ্গে দেখা দেওয়া বেশি উদ্বেগজনক।
যেমন—
- মাথাব্যথার সঙ্গে স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া
- মাথাব্যথার সঙ্গে হাত-পা দুর্বল হওয়া
- ব্যক্তিত্ব পরিবর্তনের সঙ্গে কথা বলার সমস্যা
- দৃষ্টিশক্তির সমস্যা ও ভারসাম্যহীনতা একসঙ্গে দেখা দেওয়া
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
যদি কোনো উপসর্গ—
- কয়েক সপ্তাহ ধরে থাকে
- বিশ্রামের পরও না কমে
- ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে
- দৈনন্দিন কাজে বাধা সৃষ্টি করে
তাহলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক এমআরআইসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করার পরামর্শ দিতে পারেন।
শেষ কথা
সব মাথাব্যথা বা ক্লান্তি যে ব্রেন টিউমারের লক্ষণ, এমন নয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে একই সমস্যা চলতে থাকলে বা একাধিক স্নায়বিক উপসর্গ একসঙ্গে দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। সময়মতো রোগ শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসা পরিকল্পনা সহজ হয় এবং রোগীর জীবনমান অনেকটাই উন্নত রাখা সম্ভব।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!