গুঁড়া দুধে ৬৭% ভেজাল! ঝুঁকিতে শিশুদের জীবন
শিশুদের নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করতে বাবা–মায়েরা সাধারণত পরিচিত ও দামি ব্র্যান্ডের গুঁড়া দুধের ওপরই ভরসা করেন। তবে সাম্প্রতিক অনুসন্ধান ও ল্যাব পরীক্ষার ফল সেই আস্থাকেই বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
পরীক্ষায় দেখা গেছে, বাজারে প্রচলিত একাধিক পরিচিত গুঁড়া দুধের ব্র্যান্ডে প্রকৃত দুগ্ধ উপাদানের পরিমাণ অত্যন্ত কম, বরং সিংহভাগই ভেজাল উপাদানে ভরা। একটি জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের গুঁড়া দুধে মাত্র ১৭ শতাংশ দুগ্ধ উপাদান পাওয়া গেছে, যেখানে মোট ভেজালের পরিমাণ ৬৭ শতাংশেরও বেশি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সস্তা ‘হয়ে পাউডার’সহ বিভিন্ন ধরনের সাদা পাউডার মিশিয়ে আকর্ষণীয় মোড়কে এসব পণ্য বাজারজাত করা হচ্ছে। সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) খাদ্য পরিদর্শকরা ‘গোয়ালিনী ডেইলি ফুলক্রিম মিল্ক পাউডার’-এর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠান। ল্যাব রিপোর্টে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই গুঁড়া দুধে দুগ্ধ উপাদান ছিল মাত্র ১৭ দশমিক ০৮ শতাংশ। এর মধ্যে ৫৮ দশমিক ৯২ শতাংশ ও অন্যান্য উপাদানে আরও ৮ দশমিক ৫২ শতাংশ ভেজাল পাওয়া গেছে। যেখানে দুগ্ধ চর্বির মান থাকার কথা ছিল প্রায় ৪২ শতাংশ, সেখানে পাওয়া গেছে মাত্র ৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ। একইভাবে, প্রোটিন থাকার কথা ছিল অন্তত ৩৪ শতাংশ, কিন্তু মিলেছে মাত্র ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ।
এই ঘটনায় বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত গোয়ালিনী ডেইলি ফুলক্রিম মিল্ক পাউডার বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করেন। পাশাপাশি এসএ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মো. সাহাবুদ্দিন আলমের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়। পরে আদালতে হাজির হয়ে তিনি দোষ স্বীকার করেন এবং ভেজাল পণ্য বাজার থেকে তুলে নেওয়ার আশ্বাস দেন।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুধু গোয়ালিনী নয়—আসলাম টি কোম্পানির ফুলক্রিম মিল্ক পাউডার, ডানো, ড্যানিশ, নেসলে ও স্টারশিপসহ আরও কয়েকটি ব্র্যান্ডের গুঁড়া দুধ ল্যাব পরীক্ষায় মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এসব পণ্যের আমদানিকারকদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক ভেজাল পণ্যের মোড়কে বিএসটিআইয়ের লোগো ও কিউআর কোড ব্যবহার করা হচ্ছে, যা অনেক ক্ষেত্রেই নকল। বিএসটিআই কর্তৃপক্ষ ভোক্তাদের কিউআর কোড স্ক্যান করে পণ্যের নিবন্ধন যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছে।
শুধু গুঁড়া দুধ নয়, আমদানিকৃত কিটক্যাট চকলেটসহ বিভিন্ন শিশুখাদ্যেও মানহীন ও ক্ষতিকর উপাদান পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ভেজাল খাদ্য শিশুদের কিডনি, মস্তিষ্কসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শিশু খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান ও ল্যাব পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেজাল রোধে আরও কঠোর নজরদারি, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!