Dark Mode
Image
  • Thursday, 29 January 2026

টরন্টোর আকাশ ছুঁয়ে থাকা দানব: সিএন টাওয়ারের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা

টরন্টোর আকাশ ছুঁয়ে থাকা দানব: সিএন টাওয়ারের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা

বিমান ধীরে ধীরে নামছে টরন্টো পিয়ারসন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দিকে। জানালার পাশে বসে নিচে তাকাতেই চোখ আটকে গেল এক বিশাল অবয়বে—শহরের বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা সুউচ্চ এক দানব। রোদে ঝলমল করা ধাতব দেহ, মাথায় মেঘের ছায়া। মুহূর্তেই মনে প্রশ্ন জাগল—এই কি সেই বিখ্যাত CN Tower? যাকে বলা হয় কানাডার গর্ব, টরন্টো শহরের প্রাণকেন্দ্র।

প্রথম দর্শনে বিস্ময়

সিএন টাওয়ার কেবল ইস্পাত, কাচ আর কংক্রিটের স্থাপনা নয়—এটি টরন্টোর আত্মপরিচয়ের অংশ। স্থানীয়দের মুখে প্রায়ই শোনা যায়, “If you haven’t seen the CN Tower, you haven’t seen Toronto.” প্রতিদিন হাজারো পর্যটক এখানে আসেন—পরিবার, প্রিয়জন কিংবা একাকী ভ্রমণকারী হয়ে। সবাই ফিরে যান বিস্ময় আর মুগ্ধতা নিয়ে।

টরন্টোতে পৌঁছে একদিন বিশ্রামের পর প্রথম গন্তব্য ছিল এই টাওয়ার। লেক অন্টারিওর তীর ধরে হাঁটতে হাঁটতে দূর থেকে যখন টাওয়ারটি চোখে পড়ল, মনে হলো আকাশ ছুঁয়ে থাকা কোনো বিশাল জাহাজের মাস্তুল। কাছে আসতেই মাথা ঘুরে যায়—৫৫৩ মিটার (১,৮১৫ ফুট) উঁচু এই স্থাপনার দিকে তাকিয়ে থাকা যেন শেষই হয় না।

ইতিহাসে লেখা এক আকাশছোঁয়া অধ্যায়

১৯৭৬ সালে নির্মিত সিএন টাওয়ার একসময় ছিল বিশ্বের সর্বোচ্চ মানবনির্মিত স্থাপনা। যদিও পরে সেই খেতাব দখল করে নেয় দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা, তবু টরন্টোবাসীর গর্বে এতটুকু ভাটা পড়েনি। সত্তরের দশকে কানাডিয়ান ন্যাশনাল রেলওয়ে কোম্পানি এটি নির্মাণ করে টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তির প্রতীক হিসেবে। ‘CN’ নামটি এসেছে ‘Canadian National’ থেকেই।

১৯৭৩ সালে শুরু হয়ে মাত্র ৪০ মাসে এই প্রকল্প শেষ হয়—তৎকালীন প্রযুক্তিতে যা ছিল এক রীতিমতো সাহসী ও বিস্ময়কর উদ্যোগ। আজও এটি কানাডার উদ্ভাবনী শক্তির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

লিফটে উঠে আকাশের কাছাকাছি

টাওয়ারের ভেতরে ঢুকেই মনে হয় ভবিষ্যতের কোনো জগতে প্রবেশ করেছি। কাচের লিফট যখন এক ঝটকায় ওপরে উঠতে শুরু করে, বুকের ভেতর ধকধকানি আর রোমাঞ্চ একসঙ্গে চেপে বসে। মাত্র ৫৮ সেকেন্ডে পৌঁছে যাই প্রায় ৪৪৭ মিটার উঁচু অবজারভেশন ডেকে।

নিচে তাকাতেই মাথা ঘুরে যায়। পুরো টরন্টো শহর যেন একটি মানচিত্র—গাড়িগুলো পিঁপড়ের মতো ছুটছে, আর লেক অন্টারিও দেখাচ্ছে বিশাল আয়নার মতো।

সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা গ্লাস ফ্লোর। পুরো মেঝেটাই কাচের তৈরি। প্রায় দেড় হাজার ফুট নিচে মাটি দেখা যায়। প্রথমে পা রাখতে ভয় লাগলেও জানা গেল—এই কাচ ১৪ সেন্টিমিটার পুরু এবং ইস্পাতের চেয়েও শক্ত। সাহস করে দাঁড়াতেই মনে হলো, আমি যেন আকাশে ভাসছি।

আকাশে বসে খাবারের স্বাদ

এরপর গন্তব্য টাওয়ারের বিখ্যাত ৩৬০ রেস্তোরাঁ। এখানে বসে খাবার খেতে খেতে ধীরে ধীরে পুরো শহর ঘুরে দেখা যায়। এক ঘণ্টায় রেস্তোরাঁটি সম্পূর্ণ একবার ঘুরে আসে। জানালার পাশে বসে স্যালমন ফিশ আর কানাডিয়ান কফির চুমুক দিতে দিতে মনে হচ্ছিল—কোনো সিনেমার দৃশ্যের ভেতরেই সময় কাটছে। রেস্তোরাঁর কর্মীর কথায় যেন অনুভূতিরই প্রতিধ্বনি—“You are dining in the sky!”

সাহসীদের জন্য এজ ওয়াক

সিএন টাওয়ারের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর আকর্ষণ হলো ‘এজ ওয়াক’। এটি বিশ্বের সর্বোচ্চ হ্যান্ডস-ফ্রি ওয়াকওয়ে, যেখানে ৩৫৬ মিটার উচ্চতায় টাওয়ারের কিনারায় হাঁটার সুযোগ রয়েছে। নিরাপত্তা বেল্ট থাকলেও নিচ থেকে তাকিয়ে মনে হয়—মানুষগুলো যেন মৃত্যুর সঙ্গেই হাসিমুখে খেলছে। সেই সাহস আমার হয়নি। তবে ইচ্ছে রইল—আবার কখনো এলে হয়তো সাহস করে হাঁটব আকাশের কিনারায়।

Comment / Reply From

You May Also Like